খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা 1

মধু খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা Leave a comment

মধু  আমাদের অতি পরিচিত উচ্চ ঘনত্বের এক ধরনের তরল যা মিষ্টি স্বাদ ও হালকা সুগন্ধিযুক্ত।

এতে কোনোরুপ পানি বা অন্য কোনো মিষ্টি যোগ করা হয় না। ভেষজ হিসেবে মধু প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অপ্রক্রিয়াজাত মধুতে ১৮% এর নিচে আদ্রতা থাকে এই অবস্থায় মধুতে কোনো ব্যাকটেরিয়া বেচে থাকতে পারে না । তাই তরল মধু নষ্ট হয় না। তবে প্রক্রিয়াজাত মধুতে ঔষধি গুনাগুন হ্রাস পায়।

মধুর রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে, ৩৪-৪৩ শতাংশ ফ্রুক্টোজ, গ্লুকোজ ২৫-৩৭ শতাংশ, 0.৫- ৩ শতাংশ সুক্রোজ ও ৫-১২শতাংশ মন্টোজ, ২২ শতাংশ এমাইনো এসিড, ২৮শতাংশ খনিজ লবন, ১১ভাগ এনজাইম। এছাড়াও ভিটামিন বি১,বি২,বি৬, আয়োডিন, জিংক ও কপারসহ প্রায় অর্ধশতাধিক উপাদান মধুতে পাওয়া যায়। ১০০গ্রাম মধুতে ২৮৮ক্যালরি থাকে । এতে চর্বি ও প্রোটিন নেই। 

মধু প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রীসের খেলোয়াড়গন মধু খেয়ে মাঠে নামতো কারন মধু শরীরে গ্লাইকোজেন সংরক্ষন করে রাখে। পেনসিলভেনিয়া স্টেট কলেজের গবেষনায় জানা যায়, বাজারে পাওয়া অন্য ঔষধের তুলনায় এক চামুচ মধু অনেক বেশি কার্যকর। প্রাচীনকালে ক্ষত সারিয়ে তোলার চিকিৎসায় মধু ব্যবহৃত হতো কারন এতে উচ্চ এন্টিব্যাক্টেরিয়াল ও এন্টিভাইরাল উপাদান রয়েছে। সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষনা মতে, অধিকাংশ ক্ষত ও জখম উপশমে মধু ডাক্তারি ড্রেসিং এর চেয়েও বেশি কার্যকর।

ধর্মীয় শাস্ত্রমতে মধুকে  রোগমুক্তির প্রতিষেধক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা নাহল এর ৬৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন,

 “তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্যে রয়েছে রোগের প্রতিকার”

আবার সূরা মোহম্মদ-এর ১৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“জান্নাতে  স্বচ্চ মধুর নহর প্রবাহিত হবে”

হযরত আবু   হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, “ রাসূল (সাঃ) বলেছেন- যে ব্যক্তি প্রত্যেক মাস তিন দিন ভোরে মধু চেটে খায় তার কোন বড় বিপদ হতে পারে  না।”- (ইবনে মাজাহ,বায়হাকী)
অন্য হাদীসে রাসূল (সাঃ) বলেন, “মধু ও কোরআনের  মাধ্যমে তোমাদের চিকিৎসা নেয়া উচিত।”

আমাদের প্রিয় নবী মধু খেতে বড়ই ভালোবাসতেন।

স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছে মধুকে ইসলামে রোগমুক্তির জন্যে ব্যবহারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মধুকে খোদায়ী  চিকিৎসা বলা হয়ে থাকে।

মধুর উপকারিতাসমূহঃ

 

হাপানি বা এজমার সমস্যায়ঃ  ১ গ্রাম গুড়া করা গোল মরিচের সাথে সমপরিমাণ মধু ও আদা মিশিয়ে দৈনিক ৩ বার খেলে শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ হয়।

 

রক্ত পরিষ্কার করেঃ মধু রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এক গ্লাস পানির সাথে এক চামুচ বা দুই চামুচ মধু মিশিয়ে খেলে রক্ত পরিষ্কার থাকে।

 

রোগ প্রতিরোগ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেঃ নিয়মিত মধু খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মধুতে থাকা এন্টিব্যাক্টেরিয়াল উপাদান বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াকে প্রতিরোধ করে। মধু রক্তের উৎপাদন বাড়ায় এবং রক্ত কনিকা গুলোকে সক্রিয় করে তোলে যাতে করে শরীর সহজে রোগাক্রান্ত হয় না।

 

ওজন কমায়ঃ মধুতে চর্বি থাকে না। ফলে এটি সেবনে কারও মেদ বাড়ে না বা শরীর মোটা হয় না। বরং এটি পেট পরিষ্কার রাখে । ওজন কমাতে সাহায্য করে।

 

হার্টের শক্তি বৃদ্ধিতেঃ মধু হৃদপেশিকে শক্তিশালী করে। ফলে হার্টের রোগ কম হয়। সুস্থ হার্ট জীবনের জন্যে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ। ১ চামুচ মৌরি গুড়া ও ১ চামুচ মধুর মিশ্রন নিয়মিত খেলে হার্ট ভালো থাকে। 

 

যৌন দুর্বলতা দূর করেঃ যৌন সমস্যায় অনেক আগে থেকেই মধু ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মধু নারী পুরুষ উভয়ের যৌন সমস্যায় কাজ করে। মধুর সাথে ছোলা মিশিয়ে খেলে ভালো উপকার পাওয়া যায়। 

 

সর্দি-কাশি উপশম করতেঃ চায়ের সাথে মধু ও আদার রস মিশিয়ে খেলে সর্দি শ্লেষ্মা উপশম হয়। বাসক পাতার রস ও মদু মিশিয়ে খেলে কাশি সেরে যায়।

 

আমাশয় নিরাময়ে মধুঃ কচি বেল ও আমগাছের কচি চামড়া(বাকল) বাটার সঙ্গে গুড় ও মধু মিশিয়ে খেলে আমাশয় ভালো হয়ে যায়। এছাড়া কুল বা বড়ই গাছের ছাল চূর্ণের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলেও আমাশয় ভালো হয়।

 

ক্ষত শুকাতে মধুঃ শরীরের বাইরের কোনো অংশের ক্ষতে মধুর প্রলেপ লাগিয়ে দিলে  ক্ষত দ্রুত শুকায়। পানিতে অল্প মধু মিশিয়ে খেলে পাকস্থলির ক্ষত শুকিয়ে যায়।

 

শিশুর দৈহিক বৃদ্ধিতেঃ শিশুদের দৈহিক গড়ন,রুচি বৃদ্ধি, ওজন বৃদ্ধি ও পেট ভালো রাখার জন্যে প্রত্যহ এক চা চামচ মধু গরম দুধ ও গরম পানির সঙ্গে নাশতা ও রাতের খাবারের সঙ্গে দিতে হবে। 

 

রক্তশূণ্যতায়ঃ  মধুর রক্তের হিমোগ্লোবিন বাড়াতে সাহায্য করে ফলে রক্তশূন্যতা দূর হয়। 

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করেঃ মধু ভিটামিন বি কমপ্লেক্স এর  বড় উৎস। সকালে খালি পেটে মধু খেলে এসিডিটি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।

 

রুপচর্চায় মধুঃ মধুতে উচ্চ মাত্রার এন্টিসেপটিক উপাদান থাকে । এটি ব্রণের চিকিৎসায় খুবই কার্যকর। মধু ত্বকের জ্বালাভাব দূর করে, ত্বক মসৃণ রাখে।

 

মধু খাওয়ার নিয়মঃ 

 

১. কালোজিরা গুড়া করে সাথে সমপরিমান মধু মিশিয়ে খাওয়া যায়। এটি

     অত্যন্ত উপকারী  শরীরের জন্যে। 

২. রসুন কুচি করে তার সাথে মধু মিশিয়ে খাওয়া যায় এতে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

৩. লেবু ও মধু মিশিয়ে খাওয়া যায়। এক গ্লাস হালকা গরম পানির সাথে লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে খেলে  পেট পরিষ্কার থাকে । সারাদিন শরীর ফুরফুরা থাকে। তবে মধুর সাথে খুব বেশি তাপমাত্রার গরম পানি খাওয়া উচিৎ নয়। 

 

খাটি মধু চেনার উপায়ঃ  বর্তমানে অনলাইনে প্রচুর প্রতিষ্ঠান আছে যারা মধু বিক্রি করে। এর মধ্যে অনেকেই খাটি মধু বিক্রি করে আবার অনেক অসাধু ব্যবসায়ি আছে যারা নকল মধু বিক্রি করে অধিক মুনাফা লাভের আশায়। খাটি মধুর বৈশিষ্ট্যঃ 

১.  খাটি মধু ফ্রীজে রাখলে কখনো জমাট বাধে না কিন্তু ভেজাল মধু জমাট বাধে।
২. খাটি মধুতে টক স্বাদ থাকে না নকল মধুতে টক স্বাদ থাকে।

৩. খাটি মধু পানির সাথে মিশে থাকে না।

৪. খাটি মধুতে ম্যাচের কাঠি ধরালে সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠবে। ভেজাল মধুতে আগুন জ্বলবে না।

৫. ভিনেগার গোলানো পানিতে কয়েক ফোটা মধু মেশালে যদি ফ্যানা দেখা দেয় তাহলে বুঝতে হবে সেটা খাটি মধু নয়।

৬. সুন্দর বনের মধু কিছুটা তরল হবে আর পাহাড়ী অঞ্চলের মধু ঘন হয়।

 

মধুর অপকারিতাঃ  মধুর তেমন কোনো পাশ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তবে যাদের এলার্জি আছে তাদের মধু খেলে কিছু সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত খেলে বমি বমি ভাব, জ্বালাপোড়া হতে পারে।

 

এইগুলো ছাড়াও মধুর আরো উপকার অপকার থাকতে পারে যেগুলো  আর্টিকেলে উল্লেখ করা হয়নি। এই আর্টিকেলের মাধ্যমে যদি আপনাদের সামান্যতম উপকার হয় তাতেই আমাদের স্বার্থকতা। সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *