মেথি খাওয়ার নিয়ম ও মেথির উপকারিতা

মেথি খাওয়ার নিয়ম ও মেথির উপকারিতা

মেথি খাওয়ার নিয়ম ও মেথির উপকারিতা 

মেথি সুপ্রাচীণকাল থেকে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ঔষধ এবং মেথির উপকারিতা রয়েছে অনেক। তবে মেথি শুধু পথ্য হিসেবেই নয়, মসলা ও খাবার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। মেথি শাক গ্রামে এখনও অনেক জনপ্রিয়। অধিক রূপ চর্যা করেন এমন ব্যক্তিদের জন্যে মেথি আশীর্বাদ। আমাদের আজকের আর্টিকেলে আমি চেষ্টা করব মেথি খাওয়ার নিয়ম, মেথির উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে আপনাদের  সুস্পষ্ট ধারণা দিতে। 

মেথি কি?

মেথি এক ধরনের বর্ষজীবী গাছ। বৈজ্ঞানিক নাম Trigonella Foenum Graecum।  আর ইংরেজিতে মেথিকে Fenugreek বলা হয়। মেথি গাছে একবারই ফুল ও ফল হয়ে থাকে ।

ফুলগুলো সাদা বা হলুদ রঙের হয় আর বীজ হয় চারকোনা আকৃতির । মেথির পাতা ও বীজ অন্ত্যন্ত সুগন্ধী । বীজগুলো স্বাদে তেতো। বীজগুলোকে অল্প ভেজে নিলে এই তেতো ভাব আর তেমন থাকেনা । বাংলাদেশ ও ভারতে বহুল প্রচলিত পাচ ফোড়নের একটি উপাদান মেথি । সালাদ এবং অন্যান্য খাবারে মেথি অনন্য স্বাদ যোগ করে ।  

 

মেথির পুষ্টি উপাদান

বহু ঔষধি গুনে গুনান্বিত মেথি। এর উপাদান গুলোর মধ্যে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, তামা, সেলেনিয়াম, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেশিয়াম থাকে। এছাড়া থায়ামিন, রিভোপ্লাবিন, ফলিক এসিড এর মতো  গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো থাকে যেগুলো আমাদের গলগন্ড, রক্তস্বল্পতার মতো রোগগুলোর হাত থেকে রক্ষা করে। মেথিতে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি-৬ থাকে। 

 

মেথি খাওয়ার উপকারিতা

এ পর্যন্ত কয়েকটি গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে যে, মেথি তারুণ্য বেশিদিন ধরে রাখতে পারে। 

গবেষনায় এ তথ্যও পাওয়া গেছে যে শুধু নিয়মিত মেথি খাওয়ার মাধ্যমেই  যাবতীয় ভেজাল পণ্যের বাজারেও সুস্থ থাকা সম্ভব। এ থেকে খুব সহজেই অনুমেয় যে মানব স্বাস্থ্য রক্ষায় মেথি কতটা কার্যকর। এখন তাহলে জেনে নেয়া যাক, মেথির উপকারিতা কি কি :

 

রক্তের কোলেস্টেরল কমায়

মেথি রক্তের কোলেস্টেরল এর মাত্রা কমাতে সাহায্য করে । আমাদের শরীরে ভালো কোলেস্টেরল(HDL) খারাপ কোলেস্টেরল(LDL,TG) দুটোই আছে । মেথি এই খারাপ কোলেস্টেরল LDL কে নিয়ন্ত্রনে রাখে । এগুলি স্টেরয়ডাল সেপোনিনের উৎস হিসেবে পরিচিত যা কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড এর শোষনকে বাধা দেয় । 

 

হৃদরোগের ঝুকি কমায়

মেথি একটি সুস্থ হার্ট বজায় রাখতে সাহায্য করে । মেথিতে উপস্থিত গ্যালাক্টোম্যানান হার্টকে রোগ ব্যাধি থেকে রক্ষা করে । এছাড়া মেথিতে থাকে উচ্চ পরিমাণের পটাশিয়াম যা রক্তচাপ ও হৃদ স্পন্দন  নিয়ন্ত্রনে রাখে । পটাশিয়াম, সোডিয়াম এর ক্রিয়া প্রতিরোধ করে হার্টকে ভালো রাখে ।

 

ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রন করে

ডায়াবেটিস রোগীদের অবশ্যই তাদের খাদ্য তালিকায় মেথি রাখা উচিৎ। মেথিতে উপস্থিত গ্যালাক্টোম্যানান রক্তের শর্করার পরিমান নিয়ন্ত্রনে রাখে। এর মধ্যে ইন্সুলিন উৎপাদন করার মতো এমাইনো এসিডও থাকে। তাই ডায়াবেটিসে যারা ভুগছেন তারা নিয়মিত মেথি খাবেন। অবশ্যই মেথি বীজ অথবা পাতা স্পেশালি ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর।

 

হজমে সাহায্য করে

মেথি ফাইবার এবং এন্টি অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি শরীর থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন বের করে দিতে পারে একইসাথে হজমে সাহায্য করতে পারে । মেথি চা  বদহজম ও পেটের ব্যথা উপশম করে ।

 

গ্যাস্ট্রিক / এসিডিটির সমস্যা কমায়

মেথি এসিড রিফ্লাক্স, অম্লাধিক্য কমাতে সাহায্য করে । খাবারে এক চা চামচ মেথি বীজ বুক জ্বালাপোড়া কমানোর জন্যে যথেষ্ট । মেথি বীজের মিউকিলেইজ পাকস্থলি ও অন্ত্রের আস্তরনকে আবৃত করে এবং গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল টিস্যুগুলোকে প্রশমিত করে। খাওয়ার আগে আমরা মেথি বীজগুলোকে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে পারি যাতে এর বাইরের আবরনগুলো মিশ্রিত হয়।

 

ওজন কমায়

মেথিতে প্রাকৃতিক দ্রবনীয় ফাইবার থাকে যা আমাদের ক্ষুদাকে দমন করে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে । পেট ভরা অনুভব হয়। যারা ওজন কমাতে চান তাদের উচিত হচ্ছে সকালে খালি পেটে ভেজানো মেথি বীজ চিবিয়ে খাওয়া। 

 

জ্বর ও গলা ব্যথায়

শীতে আমাদের বেশি বেশি জ্বর ঠাণ্ডা গলাব্যথা হয়। এগুলোর জন্যে আমরা প্রয়োজন অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক খেয়ে থাকি অথচ  এক চা চামচ লেবু ও মধুর সাথে মেথি মিশিয়ে খেলে তাৎক্ষনিক এসব জ্বর সেরে  যায় । মেথির মিউকিলেজ গলাব্যথা, কাশি এসব উপশম করে।

 

স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্যে

মেথি স্তন্যদানকারী মায়েদের দুধের পরিমান বৃদ্ধি করে এটি পরীক্ষিত। মেথিতে ডায়োসজেনিন থাকে যা স্তন্যদানকারী মায়েদের দুধের পরিমান বৃদ্ধি করে। যেসব মায়েদের পর্যাপ্ত দুধ উৎপন্ন হয় না সেসব মায়েরা নিয়মিত খাবারে  মেথি রাখতে পারেন এতে সন্তান পর্যাপ্ত দুধ পাবে। 

 

সন্তান জন্মদান সহজ করে

মেথি গর্ভবতী মায়েদের জরায়ুর সংকোচনকে উদ্দীপিত করে সন্তান জন্ম দেয়াকে সহজ করে। এটি প্রসব ব্যথা কমায় বলেও জানা যায়। তবে গর্ভাবস্থায় বেশি বেশি মেথি বীজ খাওয়া যাবে না কারন এতে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে ।

 

মাসিকের অস্বস্তি কমায়

মেথি অনিয়মিত মাসিকের সমস্যা কমায়। মেথিতে ডায়োসজেনিন ও আইসোফ্লাভোনের মতো যৌগ রয়েছে যা ইস্ট্রোজেনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, এগুলো মাসিকের বিভিন্ন সমস্যাগুলোকে উপসম করে । মেয়েদের মাসিকের সূচনালগ্নে, গর্ভাবস্থায় ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয় । তাই এই সময় মেথির মতো প্রচুর আয়রন সমৃদ্ধ সবুজ শাক সবজি খাওয়া উচিৎ। 

 

যৌনশক্তি বৃদ্ধি করে

শুধু আমাদের দেশ কিংবা ভারত উপমহাদেশ নয় বরং এখন বিশ্বের বহু দেশেই যৌন সমস্যা বা যৌন অক্ষমতা মারাত্বক আকার ধারন করেছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে প্রায় ১৫-৩০লাখ মার্কিন পুরুষ যৌন সমস্যায় ভুগেন । এশিয়ায় যা প্রায় ৪২ শতাংশ। নারী পুরুষের প্রজনন হরমোন কমে যাওয়া যৌন সমস্যার অন্যতম কারন । মেথি এই যৌন সমস্যাগুলো দূর করতে পারে। মেথিতে থাকা ডায়োসজেনিন প্রজনন হরমোন বৃদ্ধি করে । 

 

ক্যান্সার প্রতিরোধ করে

মেথি খুব শক্তিশালীভাবে কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে । মেথির ফাইবার উপাদান খাবারের টক্সিনগুলোকে আলাদা করে বের করে দেয়। ফলে কোলনে কোনো টক্সিক উপাদান অবস্থান করতে পারে না ও প্রদাহ তৈরি করতে পারে না। ফলে কোলনের শ্লেষ্মা ঝিল্লি ক্যান্সার থেকে রক্ষা পায় । 

 

ত্বকের যত্নে ও ত্বকের প্রদাহ দূর করতে

 মেথিতে শক্তিশালী এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা ত্বকের যেকোনো ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে । এছাড়াও ত্বকের পোড়া, একজিমা এগুলোও দূর করে মেথি । ফেইসপ্যাক গুলোর সাথে মেথি ইউজ করলে ব্রণ, ব্লাক হেডস, বলিরেখা ইত্যাদি দূর হয়।

 

চুলের জন্যে মেথির উপকারিতা

চুলের যত্নে মেথি বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। বয়স একটু বাড়লেই, নানান স্ট্রেস এর কারনে আমাদের চুল পড়া শুরু করে। একবার চুল পড়া শুরু হলে তা যেন আর থামেই না । মেথি চুল পড়া রোধ করে। মেথিতে লিথিসিন থাকে যা চুলের গোড়া মজবুত করে চুল পড়া আটকায় । এছাড়া মেথিতে প্রচুর ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি থাকে যা চুলের গোড়া শক্ত করে ।

মেথি গুড়া করে পেস্ট বানিয়ে চুলে দিলে চুল চকচক করে ও ঘন কালো হয় । সিদ্ধ মেথি সারারাত নারকেল তেলে ভিজিয়ে রেখে সকালে চুলে লাগালে চুল পড়া কমে যায়।

 

মেথি খাওয়ার নিয়ম

মসলা হিসেবে মেথি সবচেয়ে বেশি খাওয়া হলেও এটি বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। মেথি যেহেতু তেতো তাই মুখের তেতো দূর করা উপায় হিসেবে এমন একটি রেসিপি তৈরি করে রাখতে পারেন এক চামচ  মেথি বীজ হালকা করে গুড়া করে নিন। মেথি গুড়া গুলোকে এক কাপ তাজা সেদ্ধ পানিতে ২-৩ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখুন । এরপর এতে লেবু ও মধু যোগ করে নিন । ব্যস হয়ে গেলো। এবার এটিকে চায়ের সাথে বা অন্য খাবারের সাথে খেতে পারেন। অনেকে মেথি গুড়া করার নিয়ম জানতে চান, তাদের জন্যে বলছি, মেথিকে কড়া রৌদে শুকিয়ে নিন। এরপরে হালকা তেল দিয়ে ভেজে নিন। এই ভাজা মেথিকে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিলেই মেথির পাউডার হয়ে যাবে। আর ব্লেন্ডার না থাকলে পাটায় বেটে নিন তাহলেও হবে। মেথি গুড়া এখন বাজারে খুব সহজলভ্য, অনলাইনে বাসায় বসেও কিনতে পারেন। এছাড়া মেথির ক্যাপসুলও এখন ঔষধের দোকানে পাওয়া যায় ।

 

মেথির অপকারিতা

মেথির তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অপকারিতা নেই। তবে গর্ভবতী মায়েরা অতিরিক্ত মেথি সেবনে প্রিম্যাচিউর বেবি হতে পারে, তাই এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। ডায়াবেটিসের রুগীরা মেথি সেবনে অনেক সময় ডায়াবেটিস অতি মাত্রায় নেমে যায় যার ফলে ক্ষতি হতে পারে। মেথির তেতো স্বাদ অনেকের অস্বস্তিকর বা বমি বমি ভাব, বমি হতে পারে।

 

পরিশেষে

এতক্ষন মেথির গুনাগুন নিয়ে অনেক আলোচনা করলাম আশা করি এ থেকে আপনারা সামান্য পরিমান হলেও উপকৃত হবেন। যারা সময় নিয়ে আমাদের আর্টিকেলটি পড়েছেন তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Main Menu