কালোজিরার উপকারিতা কি

কালোজিরা খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা Leave a comment

কালোজিরাকে আমরা সাধারনত দেখতে পাই ছোট ছোট কালো দানার মতো করে। কিন্তু এই দানাগুলোর  উপকারিতা এত বেশি যে  একটি লিখায়  তা লিখে শেষ করা যাবে না। তবুও আজ আমি ট্রাই করব আপনাদের সংক্ষেপে কিছু ধারনা দিতে।

কালোজিরা নামটির ইংরেজি প্রতিশব্দ  Black Cumin. বৈজ্ঞানিক নাম Nigella sativa এই সেটিবা নামটি থেকে বুঝা যায় এটি ধান প্রজাতির উদ্ভিদ। এ উদ্ভিদটি ২০-৩০ সেমি লম্বা হয়।

গাছে ফুল ও ফল হয় । ফুলগুলো সাধা বা হালকা নীলাভ দেখতে চমৎকার। কার্তিক অগ্রহায়ন মাসে ফুল ধরে আর শীতে সেটা ফল হয়। ফুল থেকে তৈরি হয় কালোজিরার মধু যা বাজারে এখন সহজেই পাওয়া যায়। আর ফলগুলোর ভেতরে বীজ হয় । এই বীজগুলোকেই আমরা কালোজিরা বলি। 

কালোজিরা শতাধিক পুষ্টিগুনসমৃদ্ধ। কালোজিরার তেলে প্রায় ২১ শতাংশ আমিষ, ৩৮ শতাংশ

শর্করা এবং ৩৫ শতাংশ ভেষজ তেল ও চর্বি এবং  বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেলস। এছাড়াও এতে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিংক, সেলেনিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম, ভিটামিন-এ,ভিটামিন-বি ও ভিটামিন- সি  র  মতো অনেক উপকারী উপদান যেগুলো আমাদের শরীরকে রোগমুক্ত ও সক্ষম রাখতে খুবই প্রয়োজন। 

একগ্রাম কালোজিরাকে বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, এর উপদানের ২০৮মাইক্রোগ্রাম প্রোটিন,ভিটামিন বি১ ১৫ মাইক্রোগ্রাম, নিয়াসিন ৫৭ মাইক্রোগ্রাম,ক্যালসিয়াম ১.৮৫মাইক্রোগ্রাম, আয়রন ১০৫মাইক্রোগ্রাম, ফসফরাস ৫.২৬ মাইক্রোগ্রাম, কপার ১৮মাইক্রোগ্রাম, জিংক ৬০ মাইক্রোগ্রাম, ফোলাসিন ৬১০ আইইউ।

কালোজিরা প্রাচীনকাল থেকে অনেক রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। বহু প্রাচীন চিকিতসাবিধ তাদের লিখিত গ্রন্থে কালোজিরাকে শক্তিশালী প্রতিষেধক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমাদের মহানবী (সাঃ) কালোজিরাকে সকল রোগের প্রতিষেধক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত বিশ্বনবী বলেছেন, তোমরা কালোজিরা ব্যবহার কর। কালোজিরায় রয়েছে শাম ছাড়া প্রত্যেক রোগের ঔষধ। শাম হলো মৃত্যু (বুখারী)। প্রিয় নবী (সাঃ)  এর  চিকিতসা ও প্রতিষেধক গ্রহন করার বিষয়টি সত্যতার সর্বোচ্চ মানদন্ডে প্রমানিত । কারন আল্লাহ পাক কুরআনুল কারীমে বলেছেন, “আর তিনি (রাসুল সাঃ) নিজ থেকে কোনো কথা বলেন না কুরআন থেকে প্রত্যাদেশ হয় তা ব্যতিত। আর তাকে শিক্ষাদান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা। (সূরা নাজম,৩-৫)
প্রাচীন গ্রীক ও মিশরীয় সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। মিশরের মমিগুলোতে কালোজিরার তেল পাওয়া যায়। এবার তাহলে আমরা কালোজিরার উপকারিতাগুলো জেনে নিই।

চর্মরোগ দূর করতেঃ

আজকাল চর্মরোগ একবার হলে যেন আর সারতেই চায় না। আমরা ফ্লুকোনাজল, ভোরিকোনাজলসহ বিভিন্ন নামিদামি এন্টিফাংগাল ও এন্টিবায়োটিক খেয়েও যেন তেমন উপকার পাই না কিছুদিনে খেলে ভালো থাকে আবার ফিরে ফিরে আসে সমস্যা। সেক্ষেত্রে কালোজিরা বেশ ভালো কাজ করে। আক্রান্ত স্থানে নিয়মিত কালোজিরার তেল লাগাতে হবে সাথে সম পরিমান কালোজিরার তেল ও কাচা হলুদের রস মিশিয়ে দৈনিক ২-৩ বার করে ২ সপ্তাহ খেলেই আশানুরুপ উপকার পাওয়া যাবে।

হার্টের সুস্থতায়ঃ

আমাদের দেশে এখন হার্টের রোগ মহামারির মতো। এমন কোনোদিন বাদ যায় না যেদিন সম্ভবত কারো হার্ট এটাকের খবর পাওয়া যায় না । এখন যারা হার্টের রোগে অলরেডি আক্রান্ত হয়ে গেছেন কিংবা এখনো হননি তবে সামনে হতে পারেন তাদের প্রত্যেকেরই এই ভেষজটি নিয়ম করে সেবন করা প্রয়োজন। এক চা চামচ কালোজিরার তেল ও এক কাপ দুধ প্রতিদিন দুইবার খেলে হার্টের রোগ থেকে ভালো থাকা সম্ভব। যাদের হার্ট এটাক হয়েছে কিংবা ব্লক আছে তারা নিয়ম করে কালোজিরার তেল বুকে মালিশ করতে পারেন।

শ্বাসকষ্ট উপশম করতেঃ

শ্বাসকষ্টে যারা ভুগছেন তারা যানেন এটির ভয়াবহতা, জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এই শ্বাসকষ্ট। নিয়মিত দামি ইনিহেলার ইউজ করতে হয় সাথে শ্বাসকষ্টের ঔষদও বেশ  ব্যয়বহুল।

নিয়মিত খাবার তালিকায় কালোজিরার বর্তা রাখা যায়।  রঙ চা এর সাথে কালজিরার তেল নিয়মিত ২-৩ বার খেলে  শ্বাসকষ্ট উপশম হবে ।

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায়ঃ

আজকাল গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নেই এমন লোক খুজে পাওয়া যায় না। আমাদের অনিয়মিত জীবনযাপন, স্ট্রেসফুল লাইফ ও অবিশুদ্ধ খাবারের কারনে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা প্রকট হয়েছে ।
নিয়মিত কালোজিরা ও মধু মিশ্রন করে খেলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব সাথে অবশ্যই নিয়ম করে খাবার গ্রহন ও বাইরের অতিরিক্ত ঝাল মসলাযুক্ত খাবার পরিহার করা প্রয়োজন।

ত্বকের যত্নেঃ

এখন শীতের মৌসুম, এ সময় আমাদের ত্বক অনেকটা রুক্ষ হয়ে যায়। বাজারে এখন নানান রকমের বডি লোশন ও তেল সামগ্রী পাওয়া যেগুলো ইউজ করলে ত্বকে আদ্রতা আসে । তবে অনেকে বাজে ক্যামিকেলের ভয়ে এসব ইউজ করেন না তারা নিশ্চিন্তে কালোজিরার তেল ইউজ করতে পারেন। এতে করে ত্বক আদ্র ও মসৃণ থাকবে।

বাতের ব্যথায়ঃ 

যারা রিউমাটয়েড আথ্রাইটিস বা অন্য কোনো বাতের ব্যথায় ভুগছেন তাদেরকে আমি পরামর্শ দিবো নিয়মিত মধুসহ কালোজিরার তেল সেবন করতে এবং কালোজিরার তেল হাটু, পিঠ, হাত পা ব্যথার জায়গা গুলোতে মালিশ করতে । এতে আথ্রাইটিস এর সমস্যা কমবে এবং ব্যথা উপশম  হবে। 

যৌনশক্তি বৃদ্ধির  ক্ষেত্রেঃ 

যৌন সমস্যায় ভুগছেন এমন লোক এখন আমাদের সমাজে কম নেই। অনেকেই ফার্মেসী থেকে ভুল্ভাল যৌনতা বৃদ্ধির ঔষধ খেয়ে সমস্যা আরো প্রকট করে ফেলেছেন। কেউ কেউ লজ্জা বা আত্মসম্মানের ভয়ে সমস্যায় থাকলেও চিকিতসা নিতে চাচ্ছেন না। তবে এমন ভুক্তভুগীদের আমি বলব কালোজিরা সেবন করতে। ৫০গ্রাম হেলেঞ্চা রস ও ২০০গ্রাম মধু মিশিয়ে সাথে কালোজিরা চুর্ন যোগ করে নিয়মিত সকালে খাবারের পর সেবন করতে তাহলে ম্যাজিকের মত উপকার পাবেন । এটি নারী পুরুষ উভয়ই খেতে পারেন।

ডায়াবেটিসেঃ

বয়স চল্লিশ না পেরুতেই এখন বেশির ভাগ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে যান। যা দিনে দিনে কিডনি, লিভার ও হার্টের নানা রোগ সৃষ্টি করতে থাকে। ডায়াবেটিসের রুগীগন নিয়মিত কালোজিরা ও ডালিমের খোসা চূর্ণ মিশ্রন করে খেতে পারেন আপনার ঔষধের পাশাপাশি। এতে করে আস্তে আস্তে ঔষধ নির্ভরতা কমে আসবে ।

উচ্চ রক্তচাপেঃ

উচ্চ রক্তচাপে যারা ভুগছেন তারা নিয়মিত রঙ চায়ের সাথে কালোজিরা মিশিয়ে খেতে পারেন । এছাড়া খাবারের সময় কালোজিরা ভর্তা খেতে পারেন তাতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে থাকবে।

মেদ ও ওজন হ্রাস করার জন্যেঃ

দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, পর্যাপ্ত দৈহিক ব্যায়াম না করায় এখন অনেকেরই মেদ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে শহর অঞ্চলের লোকেদের এমন সমস্যা বেশি হয় । এছাড়াও অনেকের থাইরয়েডের সমস্যার কারনে শরীরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়
তারা সব সময় ওজন কমানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। তারা উষ্ণ পানি , মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে তাতে কালোজিরা পাউডার ছিটিয়ে দিয়ে খেতে পারেন। আশা করি ভালো ফলাফল পাবেন।

এছাড়াও কালোজিরা স্মরনশক্তি বৃদ্ধি করে, চুল পড়া রোধ করে, দাত শক্ত করে চোখের সমস্যা দূরসহ জানা অজানা অনেক রোগেই উপকার করে। এতসব উপকারী গুনের জন্যে অনেকেই কালোজিরাকে কালোহিরা বলেও  অভিহিত করেন।

সতর্কতাঃ

কালোজিরার কোনো পাশ্বপ্রতিক্রিয়া  নেই বললেই চলে তবে কিছু সময় বেধে এটি সেবনে সতর্ক হতে হবে 

১. দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের কালোজিরা সেবন করানোর উচিত নয়।

২. গর্ভাবস্থায় এটি সেবন ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া সেবন করা যাবে না।
৩. কালোজিরা সেবন করার সময় পরিমিত পরিমানে সেবন করতে হবে।
৪. বাজারে এখন কালোজিরার বিভিন্ন দ্রব্য অনেক সহজলভ্য তাই এসব পণ্যে নকল কিনা তা যাচাই করে দেখা উচিত।

৫. কালোজিরা যারা হজম করতে সমস্যা হয় তারা এটি ধিরে ধিরে অভ্যাস করে নিবেন । কারন  হঠাত করে বেশি খেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *