কাজু বাদাম এর উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম

কাজু বাদামের উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম Leave a comment

কাজু বাদাম এক ধরনের বাদাম যা কাজু গাছ(বৈজ্ঞানিক নামঃ Anacardium occidentale) নামক বৃক্ষ থেকে পাওয়া যায়। কাজু বাদাম এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Cashew Nuts. বৃক্ষ জাতীয় ফসলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাজু বাদামের স্থান তৃতীয়। এর বীজ থেকে পাওয়া বাদাম অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও অনেক মূল্যবান। কাজু বাদাম দেখতে কিডনি’র আকৃতির। 

 

কাজু বাদাম এর উৎপত্তিস্থল মনে করা হয় মধ্য ও দক্ষিন আমেরিকাকে। তবে বর্তমানে ভারত, মালয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ আফ্রিকার দেশ কেনিয়া, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কারে এটি ব্যাপকহারে উৎপাদিত হয়।

 

বাংলাদেশে আজ থেকে প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃষকদের উন্নয়নের জন্যে প্রচুর চারাগাছ লাগানো হয়। এর মধ্যে কাজু গাছের চারাও ছিল। কালক্রমে সেগুলো ফল দিতে থাকে। কিন্তু বাজাতকরণের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় তখন এগুলোর বেশিরভাগ অবিক্রিত থাকতো তবে ২০১৬ সাল থেকে সরকারের কৃষি বিভাগের উদ্যোগে এটি বাজারজাতকরন, প্রক্রিয়াজাতকরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে খাগড়াছড়ির পাহাড়ী কৃষি গবেষনা কেন্দ্র,হর্টিকালচার সেন্টার, সেনানিবাস,পাঙ্খাইয়া পাড়া, জামতলী, কোমলছড়ি এলাকায় প্রচুর কাজু বাদামের গাছ চোখে পড়ে। সাধারণত কৃষকরা কাজু বাদাম প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলেও শুধু বাদাম বিক্রি করে টন প্রতি ১০০০০০-১২০০০০ টাকায়। বাংলাদেশ এখন স্বল্প পরিসরে থাইল্যান্ড ভিয়েতনাম ও ভারতে এই বাদাম রপ্তানি করে। 

 

কাজু বাদামের পুষ্টিগুনঃ কাজু বাদাম উচ্চ পুষ্টিগুনসমৃদ্ধ একটি ফল। আয়রন, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেশিয়াম,সেলেনিয়াম,কপার, ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন ই উপাদানে ভরপুর কাজু বাদাম । ১ আউন্স  কাজু বাদাম থেকে প্রায় ১৫৭ ক্যালরি, ৫.১৭ গ্রাম প্রোটিন, ১২.৪৩ গ্রাম ফ্যাট, ৮.৫৬ গ্রাম শর্করা, ০.৯ গ্রাম ফাইবার, ১.৬৮ গ্রাম চিনি পাওয়া যায়। 

 

কাজু বাদাম এর উপকারিতাঃ  

কাজু বাদামের অনেকগুলো উপকারিতা রয়েছে যেমনঃ-

 

হার্টের জন্যে উপকারীঃ  কাজু বাদাম হার্টের জন্যে উপকারী একটি ফল। একটি গবেষনায় দেখা যায় কাজু বাদাম নিয়মিত খেলে রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড(TG) এর মাত্রা কমে আসে। ফলে হার্টে ব্লক হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। ট্রাইগ্লিসারাইড হার্ট এর রক্তনালী ব্লক করে হার্ট এটাক ও স্ট্রোক ঘটাতে সাহায্য করে।

 

ওজন কমাতে সহায়কঃ  স্থুলতা বর্তমান সময়ের অন্যতম একটি সমস্যা। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের  অনিয়ম, অতিরিক্ত ফার্স্ট ফুড গ্রহন এর ফলে আমাদের ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি গবেষনায় পাওয়া যায় ফাইবার সমৃদ্ধ কাজু বাদাম ওজন নিয়ন্ত্রনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে ও শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এর মাত্রা নিয়ন্ত্রন করে। 

 

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করেঃ  কাজু বাদামে শর্করার পরিমান কম । এতে থাকা উচ্চ মাত্রার ফাইবার রক্তের শর্করার স্পাইক প্রতিরোধে সহায়তা করে । এভাবে এটি ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সাহায্য করে।

 

চোখের জ্যোতি বাড়ায়ঃ  কাজুতে প্রচুর পরিমাণে লুটেন ও জিয়াক্সথিন এন্টি অক্সিডেন্ট থাকে যা চোখকে আলোক রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। চোখে ছাণি পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে কাজু বাদাম।

 

রক্তস্বল্পতা দূর করতেঃ প্রতি আউন্স কাজু বাদামে ১,৭ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে যা শরীরে রক্ত উৎপন্নে সহায়তা করে ও রক্তস্বল্পতা দূর করে।

 

হাড় শক্তিশালী করতেঃ  কাজু বাদামে প্রচুর ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ থাকে যা হাড় শক্ত ও ঘনত্ব বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এছাড়া এর মধ্যে কপার থাকে যা হাড়ের জন্যে খুবই উপকারী । কপারের অভাবে হাড়ে বিভিন্ন রকমের রোগ হয়। 

 

এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেঃ কাজু বাদাম এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে খুব ভালো কাজ করে। এটি হৃদরোগ, চোখের বিভিন্ন রোগ, স্মৃতিশক্তি জনিত সমস্যা প্রতিরোধ করে। কাজু বাদামের এন্টি অক্সিডেন্ট ক্যান্সার সেলের বিরুদ্ধে কাজ করে। টিউমার প্রতিরোধ করে।

 

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনেঃ  কাজু বাদামে থাকা ম্যাগনেশিয়াম উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপের রুগীরা নিয়মিত খাবার তালিকায় কাজু বাদাম রাখতে পারেন।

 

কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করতেঃ  কাজু বাদাম রেচন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। এর মধ্যে থাকা ফাইবার হজমে সাহায্য করে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।  

 

গর্ভাবস্থায় কাজু বাদামের উপকারিতাঃ 

 

গর্ভাবস্থায় শরীর হঠাৎ হঠাৎ অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে এসময় কাজু বাদাম তাৎক্ষনিক শরীরে শক্তি বৃদ্ধি করে। গর্ভাবস্থায় সময় কাটানোর জন্যে এটি আদর্শ স্ন্যাক। এতে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্যে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ভিটামিন থাকে। এর এন্টিব্যাক্টেরিয়াল উপাদান এ সময়ে  নানা ধরনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এ সময় নারীরা সবচেয়ে বেশি রক্তস্বল্পতায় ভোগেন,  কাজু বাদামে থাকা আয়রন গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা দূর করে। গর্ভাবস্থায় কাজু বাদাম খেলে ভ্রুণের রক্ত কনিকার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। কাজু বাদামে থাকা ভিটামিন-কে গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। লিপিদের প্রোফাইলের মাত্রা  নিয়ন্ত্রণ করে।

 

কাজু বাদামের রেসিপিঃ কাজু বাদাম মসলা হিসেবে বিভিন্ন খাবারের সাথে ব্যবহার করা হয়।

কাজু বাদাম দিয়ে মিল্কশেক, হালুয়া ও পোলাও তৈরি করা হয়। 

 

কাজু বাদাম পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ার কারনঃ  কাচা কাজু বাদামে ট্যানিন থাকে যা হজমে সমস্যা করে । পানিতে রাখলে এটি দূর হয়ে যায়। এছাড়া কাজু বাদামের বাইরের আবরনে সাইট্রিক এসিড থাকে, অতিরিক্ত এসিড মানুষের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, এসিডিটির সমস্যা তৈরি করে। পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এই সাইট্রিক এসিড নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। 

 

বয়সভেদে কাজু বাদাম খাওয়ার নিয়মঃ  সব খাবার সব বয়সে সমান পরিমানে খাওয়া যায় না । কাজু বাদাম খাওয়ার ক্ষেত্রে বয়স, শারীরিক গ্রোথ বিবেচনা করে খেলে এর পুরোপুরি পুষ্টি উপাদান পাওয়া সম্ভব হবে।

 

দুই বছরের কম বয়সী হলেঃ দুই বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের কাজু বাদাম খাওয়ানো যাবে না।

বাচ্চাদের অন্য খাবারের সাথে গুড়া করে সপ্তাহে ২-৩ বার খাওয়ানো যেতে পারে। 

 

দুই বছরের অধিক বয়সী হলেঃ  এ বয়সী বাচারা কাজু বাদাম খেতে পারে। তবে সপ্তাহে ১০০-১৫০ গ্রাম এর বেশি বাদাম খাওয়া ঠিক নয়।

 

গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রেঃ গর্ভবতী মায়েরা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০গ্রাম কাজু বাদাম খেতে পারেন যা ৪০-৬০টি বাদামের সমতূল্য। অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে খেতে হবে ।

 

কাজুবাদামে পাশ্বপ্রতিক্রিয়াঃ নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কাজু খেলে তেমন সমস্যা হয় না । কিন্তু অনিয়ম করে খেলে কিংবা অতিরিক্ত খেলে কিছু পাশ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

 

কিডনি রোগীদের প্রোটিন হজম করার ক্ষমতা কম থাকে তাই তারা কাজু বাদাম খাওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক খাবেন। 

 

এটি ফাইবারসমৃদ্ধ, তাই বেশি খেলে পেটে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

কাজু বাদামে থাকা ম্যাগনেশিয়াম ঔষধের কার্যক্রমে বাধা দেয়, তাই যারা বিভিন্ন ঔষধ খেয়ে থাকেন তারা কাজু বাদাম খাওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন।

 

যাদের কাজু বাদামে এলার্জি আছে, তারা এটি এড়ীয়ে চলবেন।

 

পরিশেষে আপনাদের বলতে চাই, কাজু বাদাম একটি সুস্বাদু ও অর্থকারী ফসল। সরকারী উদ্যোগে এটির চাষকে আরো উৎসাহিত করা হলে এটি রপ্তানী করে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু এটি চাষের উপযোগী। কাজু বাদামের পরিপূর্ণ পুষ্টি পেতে আমাদের অবশ্যই নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমানে কাজু বাদাম খাওয়া উচিৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *