কাঁচা আদা খাওয়ার নিয়ম, আদার উপকারিতা

কাঁচা আদা খাওয়ার নিয়ম, আদার উপকারিতা

কাঁচা আদা খাওয়ার নিয়ম, আদার উপকারিতা


আদা আমাদের সকলের খুবই পরিচিত একটি ভেষজ উপাদান। এটি সাধারনত মসলা হিসেবে বিভিন্ন তরকারির সাথে ব্যবহৃত হয়। মসলা হলেও এটি বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। আমরা চা এর সাথে আদা খাই, আবার কাশির জন্যে চিবিয়েও এটি খাই। ভেষজ গুনাবলি সম্পন্ন উপাদানের মধ্যে আদা অন্যতম। এজন্যে অনেক সময় আদাকে রোগ নিরাময়ের দাদা বলা হয়। এমন রোগ খুজে পাওয়া কঠিন যে রোগে আদা উপকার করে না। আজ আমরা
আদা খাওয়ার নিয়ম, কাঁচা আদা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে জানবো। 

 

আদা কি?

আদা মূলত এক ধরনের উদ্ভিদ মূল। এটি ছোট রাইজোম জাতীয় বিরুৎ । লম্বায় ১-২ ফুট হয়। আদার ভেতরের রঙ হলুদ,  স্বাদ হয় তীব্র ঝাঝালো। এটি প্রধানত মসলা হিসেবে ব্যবহার হলেও  খাদ্যশিল্প, সুগন্ধি, ঔষধশিল্প, কোমল পানীয় তৈরিতেও এর  ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় । আদাকে ইংরেজিতে Ginger বলে। এটি এশিয়া থেকে ইউরোপে রপ্তানী হয়। আদাকে অনেকদিন সংরক্ষনের জন্যে শুকিয়ে রাখতে হয়। 

 

আদার পুষ্টি উপাদান

আদায় পানির পরিমান সবচেয়ে বেশি শতকরা প্রায় ৮০.৮ ভাগ। এরপর শর্করা ১২.৩ ভাগ। আমিষ ও খনিজ পদার্থ থাকে প্রায় ২-৩ ভাগ করে। আদায় ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম,লৌহ, জিংক, ফসফরাস, সোডিয়াম, বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই এবং ভিটামিন বি কমপ্লেক্স থাকে। এসব উপাদান মানব দেহের জন্যে খুবই উপকারী। 

 

আদা খাওয়ার উপকারিতা

প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন রোগে মানুষজন আদা খেয়ে আসছে। গ্রীসে এটি খাওয়ার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। আদার ঔষধি গুনাগুন ব্যাপক। চলুন আমরা এখন এক এক করে জেনে নিই যে আদা খাওয়ার উপকারিতা কি কি

 

মনোযোগ বৃদ্ধি করে

আদা মানুষের মস্তিষ্কের কার্যাবলি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আদায় থাকা এন্টি অক্সিডেন্ট স্নায়ুকে শক্তিশালী করে। ফলে যেকোনো কাজে পূর্ন মনোযোগ দেয়া যায়। বর্তমান  সময়ে আমাদের অতি ব্যস্ততা, দীর্ঘসময় ইলেট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ফলে আমাদের মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে ক্ষতি সাধিত হয় যার ফলে আমরা বারবার কাজে মনোযোগ হারিয়ে ফেলি। মনোযোগের এই সমস্যা যদি আপনার মধ্যে থেকে থাকে পাঠক তাহলে আপনার জন্যে আমার পরামর্শ হলো নিয়মিত আদা চা খাবেন সাথে হলুদ মিশিয়ে। উপকার পাবেন নিশ্চিত থাকেন। এছাড়া আদার এন্টি ইনফ্লামেটরি উপাদান মস্তিষ্কে বেশি চাপ পড়া রোধ করে। ফলে মস্তিষ্কের টিস্যু ভালো থাকে।

 

হার্ট সুস্থ রাখে

আমাদের হার্টে যেসব খারাপ কোলেস্টেরল জমে ব্লকের সৃষ্টি করে যেমন ট্রাইগ্লিসারাইড আদা এসব খারাপ  কোলেস্টেরল জমতে দেয় না । এর পরিমান কমিয়ে দেয়। ফলে হার্ট ভালো থাকে। আদা হাই প্রেসারের রুগীদের জন্যে খুবই উপকারী । এটি ব্লাড প্রেসার বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন করে মানুষকে হার্ট এটাক, স্ট্রোকের হাত থেকে রক্ষা করে। শহরের মানুষ কায়িক শ্রম না করা, ফাস্ট ফুড বেশি খাওয়া, শব্দ দূষণ এসব কারনে উচ্চ রক্তচাপে বেশি ভুগে থাকেন । অনেকেই জানেনও না যে তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাই নিয়ম করে কাঁচা আদা কিংবা আদা চা খেতে  পারেন। তাতে এই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। 

 

পেটের পীড়ায়

জীবনে কখনো পেটের সমস্যায় পড়েননি এমন কাউকে পাওয়া সম্ভব নয়। পেটের নানান সমস্যায় আদা একটি আদর্শ ভেষজ। আদা দীর্ঘদিনের আমাশয় ভালো করে। ইরিটেবল বয়েল সিনড্রমে(আইবিএস) অনেকেই ভুগছেন, জীবন যেন বিষিয়ে উঠেছে, তাদের জন্যে পরামর্শ হলো দীর্ঘদিন থেকে আদা সেবন করে যান, এক সময় এসব পেটের পীড়া থেকে স্থায়ীভাবে পরিত্রান পাবেন। পূর্বে যদি খাবারে অনিহা, অরুচি থেকে থাকে সেটাও ভালো হবে। এটি হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।

 

ডায়াবেটিসে 

যারা দীর্ঘদীন ডায়াবেটিসে ভুগছেন তারা শরীরকে স্ট্রং রাখতে ও অন্যান্য রোগের প্রকোপ কমাতে আদা খেতে পারেন । আদার একটা বিশেষ গুন হলো এটি ডায়াবেটিসের কারনে যেসব রুগীর কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই রুগীদের কিডনির সমস্যা দূর করে। 

 

ব্যথা দূর করতে

যাদের বাতজ্বর আছে বা অস্টিও আথ্রাইটিস আছে তাদের শরীরের হাড়, হাড়জোড়া প্রচুর ব্যথা হয়। এসব ব্যথার জন্যে দীর্ঘদিন ব্যথার ঔষধ না খেয়ে কাঁচা আদা খাওয়া ভালো কারন দীর্ঘদিন ব্যথার ঔষধ খেলে কিডনি মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হবে অপরদিকে দীর্ঘদিন আদা খেলে শরীরের ব্যথা কমবে এবং অন্যান্য অনেক উপকার পাওয়া যাবে।

 

শীতে জ্বর ঠান্ডায় 

এখন শীতের মৌসুম। শীত আসতে না আসতেই দেখা যায় আমাদের জ্বর সর্দি লেগে যায়। যাদের সাইনুসাইটিস, এজমা এগুলি  আছে তাদের পকেটে পকেটে ড্রপ, স্প্রে কিংবা ইনহেলার নিয়ে ঘুরতে হয় । হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বাচ্চাদের আধিক্য দেখা যায় । তবে ঠান্ডাজনিত এই সমস্যাগুলোতে আদা খুব ভালো কাজ করে। আদার সাথে রসুন মিশিয়ে, পেয়াজ ও অন্য মসলা দিয়ে এক ধরনের স্যুপ বানানো যায় যা শীতকালীন এই সমস্যাগুলো থেকে আমাদের ভালো রাখে। 

 

এজমা বা শ্বাসকষ্টে

রেস্পিরেটরি যেকোনো সংক্রমনে আদা খাওয়ার প্রচলন অনেক পুরোনো। এখনো গ্রামগঞ্জে এটার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। গত বছর করোনায় আদা খাওয়ার ধুম পড়েছিল। এজমা যেহেতু একটি রেস্পিরেটরি সিস্টেমের অসুখ তাই এতে আদা অনেক ভালো কাজ করে। এজমার ঔষধ অনেক ব্যয়বহুল দরিদ্রদের জন্যে। তাই এজমায় ভুগে থাকলে নিয়মিত আদা চা, কাঁচা আদা, তরকারীর সাথে আদা খেতে পারেন এতে শ্বাসকষ্ট উপশম হবে । হয়তো ঔষধ না খেয়েও থাকতে পারবেন। 

 

ক্যান্সার প্রতিরোধ করে

আদা ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভেষজ। বর্তমানে খাবারে ভেজাল, প্রসাধনীতে ভেজাল, বায়ু দূষিত এ সবকিছুই ক্যান্সারকে আহ্ববান করে। এজন্যে এখন ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির প্রকোপ অনেক বেড়ে গেছে। আদার শক্তিশালী এন্টি অএক্সিডেন্ট ক্যান্সার সেল জন্ম হতে দেয় না। দেহে টক্সিক উপাদানকে থাকতে দেয় না । তবে এক্ষেত্রে আদার সাথে মধু খুব ভালো কাজ করে কারন দুটোতেই উচ্চ মাত্রার এন্টি অক্সিডেন্ট থাকে ।

কাঁচা আদার উপকারিতা

রান্না করা আদার চেয়ে কাঁচা আদায় বেশি ঔষধি গুনাগুন থাকে । এটি চায়ের সাথে, দুধের সাথে কিংবা চিবিয়ে খাওয়া যায় । কাঁচা আদা যেসব উপকার করে-

১.  বমি বমি ভাব দূর করে। মাথা ব্যথা করলে, কিংবা যানবাহনে অনেকের বমির ভাব হয় । এ সময় এক টুকরো কাঁচা আদা মুখে দিতে পারেন তাতক্ষনিক বমির ভাব দূর হয়ে যাবে। 

২. গলা ব্যথা উপশম করে । 

৩. সর্দি কাশি দ্রুত সারিয়ে তুলে।

৪. ক্ষতস্থানে এটির রস দিলে সংক্রমন হয় না। ক্ষত দ্রুত শুকায়। 

৫. দাতের সংক্রমনে কাঁচা আদা খাওয়া যায় । ফলে জীবানু মরে যায় এবং সংক্রমন দ্রুত ভালো হয়। 

৬. কাঁচা আদা মেদ কমায়।

 

এসব ছাড়াও আদার আরো অনেক উপকারিতা আছে যেগুলো আর্টিকেলে উল্লেখ করা হয়নি। 

 

আদা খাওয়ার নিয়ম

আদা খাওয়ার জন্যে সত্যিকার অর্থে সেরকম ধরাবাধা কোনো নিয়ম নেই । এটি ভেষজ, আপনি চাইলে কাঁচা কিংবা রান্না করে কিংবা স্যুপ বানিয়ে খেতে পারেন। তবে রান্না করা আদার চেয়ে কাঁচা আদা অধিক কার্যকর। কাঁচা আদাকে ছেঁচে খাওয়া ভালো। চা এর সাথে এটি দিতে পারেন। 

আদার রস মধু লেবু একসাথে মিশিয়ে খাওয়া যায়। সকালে গরম পানি আদা মধু মিশিয়ে খাওয়া যায় এতে সারাদিন শরীরে এনার্জি থাকে। এছাড়া আদার টুকরো চিবিয়েও খাওয়া যায়। 

 

 

আদার অপকারিতা

 

আদার অনেক ঔষধিগুন আছে তা মানতেই হবে কিন্তু কোনো পাশ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অপকারিতা নেই এমন নয়। আদার কিছু অপকারিতা আছে যেমনঃ

 

১. অতিরিক্ত আদা চা খেলে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। 

২. আদা চা খেলে অনেকের মাইগ্রেনের ব্যথা হয়। 

৩. যাদের এলার্জি আছে তারা এটি খেলে এলার্জি দেখা দিতে পারে। জিহ্বা, মুখচোয়াল ফুলে যেতে পারে। 

৪. অতিরিক্ত আদা খেলে ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কমে যায়। যাদের নিম্ন রক্তচাপ আছে তাদের এটি সেবনে সাবধানী হতে হবে।

৫. গর্ভাবস্থায় এটি খেতে সতর্ক থাকতে হবে। কারন এটি শরীরে উত্তেজনা বাড়ায়। 

 

সবশেষে 

 

আদা আসলেই একটি উপকারী খাদ্য উপাদান। তাই এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করে স্বাস্থ্য ভালো রাখতে জানতে হবে। এমন যেন নাহয় এর ভুল ব্যবহারে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। আজকে আমি চেষ্টা করেছি এই আদার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে আপনাদের সামান্য ধারনা দিতে । এর থেকে যদি আপনাদের একটুও উপকার হয় তাতেই আমাদের স্বার্থকতা। যারা সময় নিয়ে আর্টিকেলটি পড়েছেন আপনাদের সকলের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Main Menu