গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা সমূহ

গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা সমূহ

গর্ভাবস্থায় একটি স্বাস্থকর খাদ্য তালিকা মা ও অনাগত সন্তানের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষিত ও সচেতন লোকেরা এ বিষয়ে জানলেও আমাদের দেশের বিশেষ করে গ্রামীন জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই জানেনা গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা কেমন হওয়া উচিৎ। শুধু তাই নয় গ্রামে অনেক কুসংস্কার আছে এ বিষয়টি নিয়ে যেমন গর্ভাবস্থায় বেশি খাবার খাওয়া যাবে না, খেলে সন্তান বেশি বড় হয়ে যাবে ফলে অপারেশন করতে হয় নরমাল ডেলিভারি হবে না, মৃগেল মাছ খাওয়া যাবে না, কারন এটি খেলে সন্তান মৃগীরোগী হবে ইত্যাদি। এসব কুসংস্কারের কারনে গর্ভাবস্থায় মায়েরা নিয়ম করে খাবার খেতে পারে না ফলে সন্তান পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না । এর কারন এই সময়ে মায়ের খাবার যত পুষ্টিকর ও নিয়মমাফিক হবে সন্তানের দৈহিক গঠনও তত ভালোভাবে হবে। এর ব্যতিক্রমের জন্যে আমাদের দেশে এখনো অনেক মায়েরা অপুষ্টিতে ভোগা সন্তান জন্ম দেন। অহরহ মাতৃমৃত্যু, গর্ভপাত বা মৃত সন্তান জন্মদানের ঘটনা ঘটে।

আজকের আর্টিকেলে থাকবে গর্ভবতী মায়ের খাদ্য তালিকা ও গর্ভাবস্থায় করণীয়  নিয়ে পরিপূর্ণ দিক নির্দেশনা। 

 

গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা

বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেন যে একজন মায়ের ডায়েটে বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্যকর খাবার এবং পানীয় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যেগুলো  শিশুর বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। তাহলে চলুন জেনে নিই গর্ভাবস্থায় কী খাবেন এবং কী খাবেন না।

আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (ACOG) এর মতে, একজন গর্ভবতী মহিলার বেশি ক্যালসিয়াম, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন এবং প্রোটিন প্রয়োজন যেটা অন্য মহিলাদের প্রয়োজন নেই । প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ চারটি উপাদান নিয়ে আলোচনা করা যাকঃ

 

ফলিক এসিড

ফলিক অ্যাসিড হল একটি ভিটামিন (ভিটামিন বি৯) । এটি শিশুর মস্তিষ্ক এবং মেরুদন্ডে জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সাহায্য করে। জন্মগত এ সমস্যা নিউরাল টিউব ডিফেক্ট নামে পরিচিত। 

শুধুমাত্র খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় ফলিক অ্যাসিড  পাওয়া কঠিন। সেই কারণেই মার্চ অফ ডাইমস, নামের একটি জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ সংস্থা  সুপারিশ করে যে মহিলাদের গর্ভবতী হওয়ার অন্তত এক মাস আগে প্রতিদিন 400 মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিডযুক্ত ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিৎ । আর গর্ভাবস্থায় এই পরিমান  দিনে 600 মাইক্রোগ্রাম 

 বাড়াতে পরামর্শ দেয়। জার্নাল অবস্টেট্রিক্স, গাইনোকোলজি অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন এর 2019 সালের একটি গবেষণাপত্র অনুসারে, গর্ভবতী মায়েরা যারা 400-মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করেছেন তাদের শিশুদের মধ্যে নিউরাল টিউব ত্রুটির ঝুঁকি 50% কম থাকে। সবুজ শাক, সমৃদ্ধ খাদ্যশস্য , রুটি এবং পাস্তা,মটরশুটি এবং সাইট্রাস ফল ইত্যাদিতে ফলিক অ্যাসিড থাকে। 

 

ক্যালসিয়াম

এই খনিজটি শিশুর হাড় ও দাঁত এর গঠন মজবুত করে গড়ে তোলে।যদি একজন গর্ভবতী মা পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম গ্রহণ না করেন, তাহলে শিশুর গঠন স্ট্রং হবে না । গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামের চাহিদা থাকে। অনেক দুগ্ধজাত পণ্যতে ভিটামিন ডি থাকে যা ক্যালসিয়ামের সাথে কাজ করে শিশুর হাড় ও দাঁতের বিকাশ ত্বরান্বিত করে। 

 

19 বছর বা তার বেশি বয়সী গর্ভবতী মায়েদের দিনে ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন ACOG অনুসারে, গর্ভবতী কিশোরী হলে এবং  বয়স 14 থেকে 18 এর মধ্যে থাকে দৈনিক 1,300 মিলিগ্রাম প্রয়োজন। 

 

ক্যালসিয়ামের খাদ্য উৎস: দুধ, দই, পনির, ক্যালসিয়াম-ফর্টিফাইড জুস এবং খাবার, হাড়সহ সার্ডিন বা স্যামন, কিছু সবুজ শাক-সবজি।

 

লৌহ

ACOG এর মতে, গর্ভবতী মহিলাদের প্রতিদিন 27 মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন, যা গর্ভবতী নয় এমন মহিলাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণের দ্বিগুণ। রক্ত ​​তৈরির জন্য যাতে শিশু পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় সেজন্যেই অতিরিক্ত পরিমাণে খনিজ প্রয়োজন হয়। যদি একজন গর্ভবতী মহিলা  খুব কম আয়রন গ্রহন করেন, তবে তার রক্তশূন্যতা হতে পারে যার ফলে ক্লান্তি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

গর্ভাবস্থার ডায়েটে আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের সাথে ভিটামিন সি এর একটি ভাল উৎস অন্তর্ভুক্ত করা উচিত আয়রনের শোষণ বাড়ানোর জন্য। উদাহরণস্বরূপ, সকালের নাস্তায় আয়রন-ফর্টিফাইড শস্যসহ এক গ্লাস কমলার রস খান।

লৌহের খাদ্য উৎস: চর্বিহীন মাংস, হাঁস-মুরগি, মাছ, শুকনো মটরশুটি এবং মটর ইত্যাদি।

 

আমিষ

গর্ভাবস্থায় বেশি বেশি প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, তবে বেশিরভাগ মহিলারা তাদের ডায়েটে পর্যাপ্ত প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার খায় না । প্রোটিন শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তৈরিতে সাহায্য করে, যেমন মস্তিষ্ক এবং হার্ট । বিশেষজ্ঞরা গর্ভবতী মহিলাদের প্রতিদিন কমপক্ষে 60 গ্রাম প্রোটিন খাওয়ার পরামর্শ দেন। 

প্রোটিনের উৎস: মাংস, মুরগি, মাছ, শুকনো মটরশুটি এবং মটরশুটি, ডিম, বাদাম ইত্যাদি।

 

শাক সবজি

গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের খাবার তালিকা হবে  প্রচুর ফল এবং শাকসবজিসমৃদ্ধ। প্রতিদিন কমপক্ষে কয়েকটি ফল গ্রহন করা উচিৎ।  এই খাবারগুলোতে ক্যালোরি কম এবং ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থে ভরা।

 

শস্যদানা

এই খাবারগুলো শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং ফাইবার, আয়রন এবং ভিটামিন বি সরবরাহ করে। প্রতিদিন একজন গর্ভবতী মহিলার কার্বোহাইড্রেটের মোট চাহিদার অন্তত অর্ধেক শস্য থেকে আসা উচিত, যেমন ওটমিল,গমের পাস্তা বা রুটি এবং বাদামী চাল।

 

দুগ্ধ

দিনে অন্তত তিন থেকে চারটি দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া উচিৎ। দুগ্ধজাত খাবার, যেমন দুধ, দই এবং পনির, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং ভিটামিন ডি এর ভাল উৎস।

 

যেসব খাবার সীমিত করা উচিৎ

গর্ভাবস্থায় কিছু খাবার সীমিত করা উচিত কারণ এই খাবারে মা এবং বিকাশমান ভ্রূণের উপর প্রভাব পড়তে পারে।

 

ক্যাফেইন

ক্যাফেইন একটি উত্তেজক উপাদান। তাই গর্ভাবস্থায় এটি খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিৎ।

চা কফি এগুলোতে ক্যাফেইন থাকে । তাই এই খাবারগুলো সীমিত খেতে হবে। তবে ক্যাফেইনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ভিন্নমত পোষন করেন, কেউ কেউ এটি পরিহারের পরামর্শ দিলেও অন্যরা এটিকে তেমন ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেনি।

 

তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষনায় দেখা গেছে যে, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বা যারা গর্ভবতী হওয়ার চেষ্টা করছেন তাদের জন্য ক্যাফেইন সেবন কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।  অন্য একটি গবেষনায় দেখা যায়, যে মহিলারা দিনে আধা কাপের মতো কফি পান করেন তাদের গর্ভাবস্থায় কোনও কফি পান না মহিলাদের তুলনায় গড়ে কিছুটা ছোট বাচ্চা ছিল। 

 

উচ্চ মার্কিউরিযুক্ত মাছ

মাছ চর্বিহীন প্রোটিনের একটি ভাল উৎস, এবং স্যামন এবং সার্ডিন সহ কিছু মাছে ওমেগা -৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, এটি একটি স্বাস্থ্যকর চর্বি যা হার্টের জন্য ভালো । ACOG অনুসারে, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য সপ্তাহে 8 থেকে 12 আউন্স (225 থেকে 340 গ্রাম) রান্না করা মাছ। সামুদ্রিক খাবার খাওয়া নিরাপদ, যতক্ষণ না এটি একটি উচ্চ পারদযুক্ত মাছ না হয়।

 

যেসব খাবার পরিহার করতে হবে

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দেন যে গর্ভবতী মহিলাদের সম্পূর্ণরূপে এই খাবারগুলোএড়িয়ে যাওয়া উচিত।

 

এলকোহল

গর্ভাবস্থায় টোটালি অ্যালকোহল এড়িয়ে চলতে হবে। মায়ের রক্তে অ্যালকোহল সরাসরি নাভির মাধ্যমে শিশুর কাছে যেতে পারে। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) অনুসারে, গর্ভাবস্থায় প্রচুর পরিমাণে অ্যালকোহল গ্রহণের ফলে ভ্রূণের অ্যালকোহল স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হতে পারে, এটি এমন একটি অবস্থা যার মধ্যে শারীরিক সমস্যা, শিশুদের শেখার এবং আচরণগত অসুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। গর্ভাবস্থায় এলকোহল সেবনের ফলে সন্তান হারানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

 

পাস্তুরিত খাবার এবং কাঁচা মাংস

ইউএসডিএ-এর মতে, গর্ভবতী মহিলাদের দুটি ভিন্ন ধরনের খাদ্য বিষক্রিয়ায় অসুস্থ হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে: লিস্টেরিয়া ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট লিস্টিরিওসিস এবং টক্সোপ্লাজমোসিস, টক্সোপ্লাজমা গন্ডি প্যারাসাইট দ্বারা সৃষ্ট একটি সংক্রমণ।

 

রিভিউ ইন অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, বাকি জনসংখ্যার তুলনায় গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে লিস্টেরিওসিস প্রায় 20 গুণ বেশি দেখা যায় । সিডিসি বলেছে যে লিস্টেরিয়া সংক্রমণের কারণে নবজাতকের গর্ভপাত, মৃতপ্রসব,অসুস্থতা বা মৃত্যু হতে পারে।

 

লিস্টিরিওসিস এড়াতে যা করবেনঃ

১. পাস্তুরিত (কাঁচা) দুধ এবং এটি থেকে তৈরি খাবার। পাস্তুরাইজেশনে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া মারার জন্য একটি পণ্যকে উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করতে হবে।

২. হট ডগ, লাঞ্চ মিট এবং কোল্ড কাট ব্যাকটেরিয়া মারার জন্য খাওয়ার আগে গরম বাষ্পে গরম করতে হবে।

 

গর্ভবতী হওয়ার প্রথম মাসের লক্ষন

গর্ভবতী হওয়ার প্রথম সপ্তাহেই কিছু লক্ষন প্রকাশ পাবে। এই লক্ষনগুলোর মধ্যে মাথা ব্যথা, প্রচন্ড ক্লান্তি, স্বপ্ন দেখা ,দুর্বলতা ইত্যাদি থাকে । এসব লক্ষন দেখা দিলে প্রেগন্যান্সি স্ট্রিপ দিয়ে চেক করে নিশ্চিত হওয়া যায়। এছাড়া গর্ভবতী হওয়ার প্রথম মাসে মাথা ঘোরা, বমি, রেগুলার পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষন দেখা দেয়। এসব লক্ষন দেখা দিলেই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে থাকা উচিৎ। গর্ভবতী মায়ের আমল হিসেবে মুসলিম মায়েরা কিছু আমল করতে পারেন অনাগত সন্তান ও একটি নিরাপদ গর্ভাবস্থার জন্যে। এতে কল্যান রয়েছে। নারীর গর্ভাবস্থাকে ইসলামে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

 

পরিশেষে

প্রথমবার গর্ভবতী হওয়া নারীদের জীবনের অত্যন্ত আনন্দের একটি বিষয়। সেই সাথে অসতর্কতার কারনে তৈরি হতে পারে নানান জটিলতা। এসব জটিলতা থেকে বেচে থাকতে হলে অবশ্যই গর্ভবতী মা দেরকে যথাযথ সব নিয়ম মেনে চলতে হবে। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Main Menu