ঘি এর উপকারিতা অপকারিতা ও ব্যবহার

ঘি এর উপকারিতা অপকারিতা ও ব্যবহার

ঘি দুধ থেকে প্রস্তুত করা এক ধরনের সুস্বাদু খাবার। আমাদের উপমহাদেশে এই খাবারটি খাওয়ার রেওয়াজ অনেক পুরোনো। মূলত এই অঞ্চল থেকেই এটি তৈরি ও খাওয়ার প্রচলন হয়। সাধারণত খাবারের স্বাদ বৃদ্ধির জন্যে এটি খাবারের সাথে মিশানো হয়। আজকের আর্টিকেলে আমরা ঘি এর উপকারিতা অপকারিতা ও ব্যবহার, ঘি খাওয়ার নিয়ম নিয়ে আলোচনা করব।

 

ঘি কি?

ঘি (Ghee) দুগ্ধজাতীয় খাবার। ইংরেজিতে এটিকে Clarified Butter বলে। প্রচুর ওমেগা -3 ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিনসহ নানা ধরনের উপকারী উপাদান থাকে ঘি এর মধ্যে। আমাদের দেশের কিছু কিছু বাড়িতে প্রায় প্রতিটি রেসিপিতে ঘি ব্যবহার করা হয়। পরিশোধিত তেলের পরিবর্তে ঘি ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল কারণ এতে বিভিন্ন ধরণের প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। 

 

ঘি এর পুষ্টিগুন

ঘি তে অধিক পরিমাণে স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন এ, ই এবং ডি রয়েছে। যদিও আমরা অনেকেই মনে করি যে ঘি তে থাকা উচ্চমাত্রার চর্বি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিন্তু সত্যি হচ্ছে ঘি তে থাকা চর্বি স্বাস্থ্যের জন্যে বরং উপকারী, ক্ষতিকর নয়। এই চর্বি শরীরের জন্যে প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। ঘি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে পূর্ণ, যা একটি উপকারী চর্বি এবং মস্তিষ্ক ও হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য অপরিহার্য। এছাড়াও এটি শরীরে প্রচুর শক্তি যোগায়। সুতরাং, সামগ্রিকভাবে, আমরা বলতে পারি যে ঘি বেশ পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর।

একনজরে দেখে নেয়া যাক ঘি এর পুষ্টি উপাদান-

 

  • ঘি একটি উচ্চ মাত্রার ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার।
  •  ১০০ মিলি ঘি ৮৮৩ ক্যালরি শক্তি দেয়।
  • ঘি সম্পূর্ণরূপে চর্বিযুক্ত এবং এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, চিনি বা ফাইবার নেই। 
  • ১০০ মিলি ঘিতে প্রায় ৯৯.৮ গ্রাম ফ্যাট থাকে। ঘিতে উপস্থিত বেশিরভাগ চর্বিই স্যাচুরেটেড ফ্যাট। এতে কোলেস্টেরলও রয়েছে।
  • ঘি ভিটামিন এ, ভিটামিন ই এবং ভিটামিন কে সমৃদ্ধ যদি ঘি এর উৎস ঘাস খাওয়া গরুর দুধ হয়। তাহলে এতে বিউটারিক অ্যাসিডও থাকবে।

 

ঘি এর উপকারিতা

সুষমভাবে স্বাস্থ্য বৃদ্ধি, হার্টের স্বাস্থ্য উন্নয়ন, ক্যান্সার প্রতিরোধসহ ঘি অনেক রোগের উপকার করে। ঘি তে সম্পৃক্ত চর্বি থাকায় এটি ফ্রিজে না রেখেই অনেকদিন সংরক্ষন করা যায়। 

 

ওজন বাড়ায়

ঘি তে প্রচুর পরিমানে চর্বি থাকে যেগুলো শরীরের জন্যে উপকারী এবং শরীরের ওজন সুষমভাবে বৃদ্ধি করে। তাই কেউ ওজন বৃদ্ধি করতে চাইলে নিয়মিত ঘি খেতে পারেন।

 

দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটায়

আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্র অনুসারে, ঘি মানুষের  দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং মানুষের চোখ সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে । যারা নিয়মিত ঘি খেয়েছে তাদের উপর একটা গবেষনায় দেখা গেছে যে তাদের দৃষ্টিশক্তি অনেক প্রখর । তাই যারা চোখের সমস্যায় ভুগছেন কিংবা দেখতে সমস্যা হয় তারা নিয়মিত খাবারে ঘি রাখতে পারেন। 

 

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে

কোষ্ঠকাঠিন্য অনেক রোগের সৃষ্টি করে। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, অবসাদ পর্যন্ত হতে পারে কোষ্ঠ্যকাঠিন্য থেকে। তাই আপনি যদি কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগে থাকেন তাহলে দ্রুত সেটা প্রতিষেধক নেয়া উচিৎ। তবে দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে কন্টিনিউ মেডিসিন না নিয়ে এই শাস্ত্রীয় চিকিৎসাটি নিতে পারেন। তা হলো রাতে ঘুমানোর আগে এক টেবিল চামচ ঘি খান। এটি আপনার পরিপাকতন্ত্র নিরাময় করে আপনার হজমে সাহায্য করতে পারে, যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। নিয়মিত ঘি খেলে কোষ্ঠাকাঠিন্য থাকবে না। 

 

কাশি নিরাময় করে

শীতে কাশির প্রকোপ বাড়ে। এই কাশি অনেক সময় নিয়োমোনিয়া পর্যন্ত গড়ায় তাই এই কাশির কার্যকর প্রতিকার প্রয়োজন। কাশির চিকিৎসায় ঘি বেশ কার্যকর বলে বহু বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে। কাশি নিরাময়ের জন্যে আপনাকে যা করতে হবে তা হল সরাসরি এক চা চামচ গরম ঘি অথবা আদার গুঁড়ার সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন।

 

প্রদাহ দূর করে

গবেষণায় দেখা গেছে ঘি এর মধ্যে প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছ। যা বিভিন্ন ধরনের রোগের চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে। এটি বিভিন্ন ধরনের বাত ও বাতের ব্যথা উপশম করে। ঘি শরীরের অভ্যন্তরে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে, যা আপনার হার্টের স্বাস্থ্যের অত্যন্ত উপকারী।

 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

ঘি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। যা শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। যখন আপনার শরীর কার্যকরভাবে পুষ্টি শোষণ করে, তখন আপনার অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। কোভিডের এই সময়টাতে শরীরের ইমিউনিটি স্ট্রং রাখা অত্যন্ত জরুরী। ঘি প্রাকৃতিকভাবে শরীরকে শক্তিশালী করে ও ইউমিউন সিস্টেমকে স্ট্রং রাখে ফলে শরীর সহজে রোগাক্রান্ত হয় না।

 

উপকারী চর্বির পরিমান  বাড়ায়

খারাপ চর্বি যেমন হার্টের রোগ সৃষ্টি করে ভালো চর্বি তেমনি হার্টের রোগ প্রতিরোধ করে।

ঘি মানবদেহের উপকারী চর্বির একটি চমৎকার উৎস। আপনি যদি এটি প্রতিদিন খেতে পারেন তবে আপনার হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত হবে। ঘি শুধু হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতিই করে না, এটি ওজন কমানোর জন্যও উপকারী। ঘি কোষ থেকে বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ করতে সাহায্য করে, যা বিপাক ক্রিয়াকে উন্নত করে । যখন  বিপাক দ্রুত হয়, তখন সহজেই ওজন হ্রাস পায়।

 

অরুচি দূর করে

অনেক বাচ্চারা নানা কারনে খাবার খেতে চায় না। ঘি একাধারে শিশু ও প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষুধা বৃদ্ধি করে। বাচ্চার খাবারে ঘি মিশিয়ে দিতে পারেন। এতে বাচ্চার খাবারে রুচি বাড়বে। 

 

মাসিকের সমস্যায়

ঘি  শরীরের হরমোনের ব্যালেন্স রাখতে সাহায্য করে। মেয়েদের শরীরে হরমোনাল ইমব্যালেন্স থাকলেও অনেক সময় পিরিয়ড অনিয়মিত হয়। ঘি স্থায়ীভাবে এ সমস্যা দূর করে। থাইরয়েডের চিকিৎসায় এটি খাওয়ার একটা রীতি আছে। থাইরক্সিন নামক হরমোনের কারনে পুরুষ কিংবা নারী যে কারও হাইপার বা হাইপো থাইরয়েড হতে পারে যেটি শরীরে অনেক জটিল জটিল রোগ সৃষ্টি করতে পারে। ঘি খেলে এ হরমোনটি ব্যালেন্স থাকে। 

 

খাবারের স্বাদ বৃদ্ধি করে 

ঘি খাবারের স্বাদ বৃদ্ধি করে।  এক বাটি ডাল ঘি যোগ করার পরে আরও সুস্বাদু হয়ে ওঠে। এছাড়াও অন্য যেকোনো খাবারে ঘি যোগ করা যেতে পারে স্বাদ বাড়ানোর জন্যে।

 

দুধের বিকল্প হিসেবে

যাদের দুধে এলার্জি হয় কিংবা দুধ খেলে পেটে সমস্যা হয় তারা দুধের পরিবর্তে ঘি খেতে পারেন। ঘি তে এলার্জি হওয়ার চান্স নেই। ঘি তে দুধের পুষ্টিও পাওয়া যাবে।

 

মনোযোগ বাড়ায়

ঘি মানুষের মধ্যে পজিটিবিটি বাড়ায়। কাজে মনোযোগী হতে সাহায্য করে। ঘি মানুষের রাগ কমায়। 

 

ঘি এর মধ্যে গাওয়া ঘি হলো সবচেয়ে খাটি। এটি একেবারে গরুর দুধ থেকে তৈরি। এটি মস্তিষ্ক,হার্ট, চোখের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। আমাদের দেশে এখন ঘি অনলাইনে প্রচুর কেনা বেচা হয়। তাই নকল এড়াতে অবশ্যই সতর্ক হয়ে ক্রয় করবেন। ঘি এর  ছবি গুগল বা ইউটিউবে প্রচুর পাওয়া যায়। ঘি এর দাম কেজি প্রতি ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে হতে পারে। 

 

যেভাবে বাসায় ঘি তৈরি করবেন

ফুল ফ্যাট বা ভারী ক্রিম ব্যবহার করে সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর ঘি তৈরি করা যায়। আপনি এটি দোকান থেকে কিনতে পারেন বা দুধের উপরে স্থির ঘন ক্রিম সংগ্রহ করতে পারেন। প্রায় 2 কাপ ভারী ক্রিম নিন এবং এতে প্রায় ১ টেবিল চামচ দই যোগ করুন। এটি প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘন্টার জন্য বাইরে রেখে দিন। তারপর ক্রিমটি ৫ থেকে ৬ ঘন্টা ফ্রিজে রাখুন। এই ক্রিমে ঠান্ডা জল যোগ করুন এবং ফুড প্রসেসরে মিশ্রিত করুন, যতক্ষণ না মাখন আলাদা হয়ে যায় বাটারমিল্ককে পিছনে ফেলে। এই বাটার মিল্ক আপনি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারেন। মাখন সরিয়ে দু-তিনবার ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। তারপর এই মাখন গরম করার জন্য রাখুন।

মাখন ফুটতে শুরু করলে মাঝে মাঝে নাড়তে থাকুন। তরল অংশটি ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হবে এবং দুধের কঠিন পদার্থ প্যানের নীচে স্থির হবে।

বাকি সোনালি হলুদ তরল হল ঘি। এটি ঠান্ডা হয়ে গেলে, দুধের কঠিন পদার্থগুলি অপসারণের জন্য এটি ছেঁকে নিন।

একটি বন্ধ পাত্রে ঘি সংরক্ষণ করুন।

 

ঘি খাওয়ার অপকারিতা

অন্যসব খাবারের মতোই ঘি বেশি খেলে কিছু কিছু সমস্যা হতে পারে। যেমন পেটের অসুবিধা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হতে পারে। এছাড়া অনেক সময় অতিরিক্ত ঘি খাওয়ার ফলে চর্বির পরিমান বেড়ে হার্ট এটাকের সম্ভাবনা থাকে। উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। তাই অবশ্যই সতর্ক থেকে ঘি খেতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Main Menu