অশ্বগন্ধ্যার উপকারিতা এবং অশ্বগন্ধা খাওয়ার নিয়ম

অশ্বগন্ধ্যার উপকারিতা এবং অশ্বগন্ধা খাওয়ার নিয়ম

 

অশ্বগন্ধা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থার  সুপরিচিত ভেষজ হিসেবে আমাদের উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অশ্বগন্ধার উপকারিতা অনেক বেশি। এটি বিভিন্ন রোগ প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে নার্ভাস সিস্টেমের রিলাক্সেশন এর জন্যে খুব ভালো উপকার করে। আজকের আর্টিকেলে অশ্বগন্ধা গাছ চেনার উপায়, অশ্বগন্ধা গাছ কোথায় পাওয়া যায়, অশ্বগন্ধা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

 

অশ্বগন্ধা কি

অশ্বগন্ধা একটি ঔষধি  গাছ। ইংরেজিতে এটিকে  Indian gensing, poison gooseberry, winter cherry সহ কয়েকটি নামে ডাকা হয় । অশ্বগন্ধার বৈজ্ঞানিক নাম Withania somnifera. অশ্ব শব্দটি দিয়ে আমরা ঘোড়াকে বুঝি। অশ্বগন্ধা গাছের শিকড় থেকে ঘোড়ার মতো গন্ধ বের হয় । এজন্যে এটির অশ্বগন্ধা নামকরন করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে এটি স্ট্রেস রিলিপ, রিলাক্সেশনের জন্যে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ব্যবহার হয়ে আসছে। অশ্বগন্ধার এন্টিঅক্সিডেন্ট এত শক্তিশালী যে এটি ফ্রী রেডিকেল দ্বারা সৃষ্ট সেলুলার ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

 

অশ্বগন্ধার শাস্ত্রীয় ব্যবহার

খ্রীস্টপূর্ব প্রায় ৬০০০ বছর থেকে ভারত উপমহাদেশে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত এই চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রামে শহরে অনেকেই গ্রহন করেন। এই ৬০০০ বছরের বেশির ভাগ সময় থেকে অশ্বগন্ধা গাছ পথ্য হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। অশ্বগন্ধার ডাল, ছাল, ফুল, ফল, মূল সব কিছুই ঔষধ তৈরির কাজে লাগে। অশ্বগন্ধার মূলের টনিক এফ্রোসিডিয়াক, মাদকদ্রব্য, মুত্রবর্ধক, এন্থেলমিন্টিক, এস্ট্রিঞ্জেন্ট, থার্মোজেনিক এবং উদ্দীপক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি সাধারনত শিশুদের  দুর্বলতা, বাত, বাত রোগ, লিউকোডর্মা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিদ্রা, নার্ভাস ব্রেক ডাউন, গলগন্ড ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হতো।

 

অশ্বগন্ধার রাসায়নিক উপাদান

অশ্বগন্ধার রাসায়নিক উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে আইসোপেলেটিয়েরিন, এনাফেরিন, কিউসোহাইগ্রিন, এনাহাইগ্রিন ইত্যাদি। স্টেরয়ডাল ল্যাকটোনস এর মধ্যে উইথানোলাইডস,উইথাফেরিন । আরো রয়েছে স্যাপোনিনস। অশ্বগন্ধার সিটোইন্ডোসাইডস এবং এসিলস্টেরিলগ্লুকোসাইড এন্টি স্ট্রেস এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। এবার আসি অশ্বগন্ধা গাছ কোথায় পাওয়া যায় ও অশ্বগন্ধা গাছের উপকারিতা নিয়েঃ

 

অশ্বগন্ধা গাছ কোথায় পাওয়া যায়   

অশ্বগন্ধা গাছ বাংলাদেশ ভারত নেপাল চীন এই দেশগুলোতে সহজেই পাওয়া যায়। এই গাছগুলো শাখাবহুল এবং ফুল, ফল, পাতা থাকে। লম্বায় ২-৩ হাতের মতো হয়। এর ফলগুলো ছোট ছোট মটর দানার মতো পাকলে কমলালেবুর মত রঙ হয়। এটি শুষ্ক অঞ্চলে জন্মে। বানিজ্যিকভাবে আমাদের দেশে এটি খুব একটা চাষ না হলেও ভারতে এটি কমার্শিয়ালি চাষাবাদ করা হয়। ইউটিউবে বা গুগলে অশ্বগন্ধা গাছের ছবি, অশ্বগন্ধা সিরাপ লিখে সার্চ করলে খুব সহজেই চিনে নিতে পারবেন। গ্রামে সচরাচর এগুলো আপনারা অনেকেই দেখতে পান হয়ত না চেনার কারনে এই উপকারী গাছটি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। 

 

অশ্বগন্ধার উপকারিতা

অশ্বগন্ধা গাছের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায় এর মূল ও পাতা থেকে। অশ্বগন্ধা পাতা চায়ে প্রধানত ব্যবহার করা হয় । মূলটি বিভিন্নভাবে সেবন করা হলেও শুকনো, পাউডার হিসেবে বেশি ব্যবহার করা হয়। আজকাল এটি সাপ্লিমেন্ট হিসেবে বিভিন্ন খাবারের সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়। এটি আর্থ্রাইটিস,উদ্বেগ,অনিদ্রা,টিউমার,যক্ষ্মা,এজমা, লিউকোডার্মা,ব্রঙ্কাইটিস,মাসিক সমস্যা, ক্রনিক লিভার ডিজিজ, স্ট্রেস্‌ ফোকাস ইত্যাদির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এখন জেনে নিই অশ্বগন্ধার উপকারিতা কি কিঃ

 

ব্লাড সুগার কমায়

অশ্বগন্ধা মানুষের রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এটি সেবনে ইনসুলিন নিঃসরন বৃদ্ধি পায়। এমন অনেক উদাহরন আছে যারা কেবল অশ্বগন্ধা খেয়েই নিজেদের ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে রেখেছে তবে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রসেস। তাই যারা দীর্ঘদিন থেকে ডায়াবেটিসে ভুগছেন তারা নিজের ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এটি সেবন করতে পারেন।

 

ক্যান্সার প্রতিরোধী

বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রমানিত হয়েছে যে অশ্বগন্ধা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী একটি ঔষধ।

এটি নতুন ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ করে দেয় এবং পূর্বের ক্যান্সার কোষকে ধ্বংশ করে ফেলতে পারে। ভারতের এনসিবিআই দ্বারা পরিচালিত একটি গবেষনায় দেখা গেছে এটি টিউমারের বৃদ্ধিকে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ রোধ করে দেয়। গবেষনাটি যদিও ইদুরের উপরে হয়েছে তবে গবেষকরা আশা করছেন এটি মানুষের উপরেও আশানুরুপ কাজ করবে।

 

হার্ট ভালো রাখতে

মানবদেহের হার্টের জন্যে খুবই ক্ষতিকর একটি উপাদান  হলো ট্রাইগ্লিসারাইড। অশ্বগন্ধা এটিকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। এর সাথে রক্তের এলডিএল কমাতেও সাহায্য করে এই ভেষজ। এসব কোলেস্টেরল মানুষের হার্টে ব্লকের সৃষ্টি করে, হার্ট এটাক কিংবা স্ট্রোকের মতো ঘটনা ঘটায়। একটি গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে যে,অশ্বগন্ধা  প্রাপ্তবয়স্কদের ১৭ শতাংশ কোলেস্টেরল ও ১১ শতাংশ ট্রাইগ্লিসারাইড এর মাত্রা  কমাতে পারে। গবেষনাটি ৬০দিনের গড় ফলাফল থেকে নেয়া হয়েছিল। এটি স্বাভাবিক রক্ত প্রবাহে সাহায্য করে। ফলে হার্ট ভালো থাকে।

 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

আমাদের ইমিউনিটি দিনে দিনে কমে আসছে । এর কারন মূলত আমাদের কায়িক শ্রমহীন ও ব্যায়ামহীন জীবনযাপন । এছাড়াও মানসিক চাপ, প্রদাহ, কম ঘুমানো এগুলোও ইমিউনিটি রিডিউস করার কারন। অশ্বগন্ধা এই সমস্যাগুলো কমিয়ে আনে এবং দুর্বল কোষগুলোর কার্যকারিতা বাড়ায় ফলে শরীর শক্তিশালী হয় ও রোগ প্রতিরোধী হয়। অশ্বগন্ধা সেবন করা লোকেদের সংক্রামক ব্যাধি কম হয়। এই করোনার মধ্যে আমরা এমন অনেক ঘটনা দেখেছি যেখানে পরিবারের সবাই আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার পরেও কেউ কেউ আক্রান্ত হয় না। এর কারন তাদের স্ট্রং ইমিউনিটি।

 

মানসিক চাপ কমায়

আমাদের মানসিক চাপ বা উদ্বেগ বাড়ানোর জন্যে অনেকাংশে দায়ী হলো মস্তিষ্কের কর্টিসল নামক এক ধরনের হরমোন। যারা দীর্ঘদিন যাবত অনেক স্ট্রেস এর মধ্যে থাকে তাদের এই হরমোন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্ষরিত হয় ফলে সৃষ্টি হয় নানা ধরনের মানসিক সমস্যা। এই মানসিক সমস্যাগুলো অনুভব করা যায় যখন শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয় যেমন অনিদ্রা, নন স্পেসিফিক পেইন ইত্যাদি। বর্তমানে আমাদের খুব কমন একটা সমস্যা হলো ডিপ্রেশন যেটার জন্যেও অনেকাংশে দায়ী এই কর্টিসল হরমোন। অশ্বগন্ধা এই কর্টিসল হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরন রোধ করে। একটি গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে যে, দৈনিক ৬০০মিলিগ্রাম অশ্বগন্ধা সেবনকারীদের ৬০দিনে ৭৯শতাংশ হতাশা কমে যায়। তাই ডিপ্রেশনে যারা ভুগছেন তারা নিয়মিত নিয়ম করে অশ্বগন্ধা সেবন করতে পারেন।

 

পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

মানুষের মানসিক দুশ্চিন্তা বা স্ট্রেস সব সময় তার শরীরের উপর একটা বাজে ইফেক্ট করে। তেমনি যেসব পুরুষ অতিরিক্ত মেন্টালি প্রেসারে থাকে তাদের এই প্রেসারটা শরীরে প্রভাবিত হয়ে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে। গবেষনায় পাওয়া গেছে যে শুধু স্ট্রেস এর কারনেই অনেক পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোনের লেভেল অনেক কমে যায়। ফলে তাদের উর্বরতা হ্রাস পায়। অশ্বগন্ধা কার্যকরী ভাবে এই স্ট্রেস লেভেল কমিয়ে পুরুষের প্রজনন হরমোনের মাত্রা বাড়ায় । গবেষনা থেকে আরো জানা  যায় যেসব পুরুষ নিয়মিত অশ্বগন্ধা সেবন করে তাদের পর্যাপ্ত পরিমানে শুক্রানু থাকে। ৩ মাস অশ্বগন্ধার চিকিৎসা নেওয়ার পর ১৪ শতাংশ অনুর্বর পুরুষের সঙ্গিনী কনসিভ করতে সক্ষম হয়েছেন। 

 

প্রদাহ কমায়

শরীরের বিভিন্ন অংশে থাকা প্রদাহ আমাদের আধুনিক জীবনে বেশি বেশি রোগাক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারন। প্রদাহের অন্যতম সেরা নিরাময় হলো অশ্বগন্ধা। অশ্বগন্ধা দীর্ঘদিন বাতজ্বরে ভুগতে থাকা রুগীদের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে । আথ্রাইটিসের দ্বারা সৃষ্ট প্রদাহ কমায় অশ্বগন্ধা।

 

মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়

এক সময় মানুষের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে এই আয়ুর্বেদিক ঔষধটির বহুল ব্যবহার ছিল। তৎকালীন গবেষনায় এটাও পাওয়া গেছে যে, বিভিন্ন প্রানী ও মানুষের মধ্যে আঘাত থেকে পাওয়া মস্তিষ্কের ক্ষতি কমাতে পারে অশ্বগন্ধা।

 

অশ্বগন্ধা খাওয়ার নিয়ম

অশ্বগন্ধা আয়ুর্বেদিক ঔষধ হলেও অশ্বগন্ধা হোমিও ঔষধ হিসেবেও পাওয়া যায়। বর্তমানে বাজারে অশ্বগন্ধা পাউডার, অশ্বগন্ধা সিরাপসহ বিভিন্নভাবে এটি কিনতে পাওয়া যায়। ট্যাবলেট হিসেবেও বিভিন্ন কোম্পানি এটি বাজারে এনেছে। এসব অশ্বগন্ধা পাউডারের দাম খুব বেশি নয়। 

১০০গ্রাম পাউডার কোম্পানি ভেদে ১২০-১৮০টাকা পর্যন্ত হতে পারে । অনেকেই প্রশ্ন করেন অশ্বগন্ধা পাউডার কোথায় পাওয়া যায় বা অশ্বগন্ধা খেলে কি লম্বা হয় কিংবা অশ্বগন্ধা পাউডারের উপকারিতা কি? এর উত্তর আমি খুব ছোট করে দিই, যেকোনো ভালো ফার্মেসিতে এটি ট্যাবলেট, সিরাপ কিংবা পাউডার যেকোনো ফরমেটে কিনতে পারেন। প্রদত্ত পণ্যে সেবনবিধি স্পষ্টভাবেই দেয়া থাকে। এছাড়া অশ্বগন্ধার মূলও চাইলে বাজার থেকে কিনতে পারেন। 

 

অশ্বগন্ধার পাশ্বপ্রতিক্রিয়া 

অশ্বগন্ধার ক্ষতিকর দিক যে  নেই এমন কিন্তু না। এর কিছু সাইড ইফেক্ট আছে । তবে এটিকে বেশিরভাগ মানুষের জন্যে নিরাপদ বলে মনে করা হয়। যাই হউক, বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েরা বা গর্ভবতী মেয়েদের সেই সাথে যাদের অটোইমিউন রোগ যেমন লুপাস, রিউমাটোয়েড আথ্রাইটিস, থাইরয়েডে ইত্যাদি রোগাক্রান্তদের এটি এড়িয়ে চলতে হবে অথবা সেবন করতে চাইলে নিজের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খেতে হবে। একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয় যে অশ্বগন্ধা নিয়ে করা গবেষনাগুলো মানের দিক থেকে দুর্বল ছিল।

 

পরিশেষে

কিছু পাশ্বপতিক্রিয়া থাকলেও কয়েক হাজার বছর থেকে মানব জাতির কল্যানের কাজে আসা এই ভেষজটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলতেই হবে। এক সময় সাপের কামড়েও এটি ব্যবহার করা হতো এবং সেটি কার্যকরী ছিল। যদিও এই ধরনের কেইসে এখন সরাসরি হাসপাতালের যাওয়ার বিকল্প নেই কিন্তু এক সময় তো আর এত এত চিকিৎসালয় ছিল না। তাই যারা এই উপকারী ভেষজটি খেতে চান তারা কষ্ট করে এক্সপার্টদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে সেবন করতে পারেন । উপকার পাবেন বলে আমরা আশা করি। যারা সময় নিয়ে আর্টিকেলটি পড়েছেন তাদের প্রত্যেকের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Main Menu