ভিনেগার কি? আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা

ভিনেগার কি? আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা

আপেল সিডার ভিনেগার হলো আপেলের রস থেকে তৈরি এক ধরনের ভিনেগার যা সালাদের ড্রেসিংস, ফুড প্রিজারভেটিভ, ভিনাইগ্রেটস ও চাটনিতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষত যারা ওজন কমাতে চায় তাদের কাছে এটি খুব পরিচিত। আপেল সিডার ভিনেগার এর অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। আজকের আর্টিকেলে আলোচনা করব আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম, উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে।

 

আপেল সিডার ভিনেগার কি?

 ভিনেগার কি? ভিনেগারের ব্যবহার কোথায় হয়? এ প্রশ্নগুলো আগে জানা দরকার।  ভিনেগার হলো এসিটিক এসিড এর স্বল্প মাত্রার জলীয় দ্রবন। যারা সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা করেছেন তারা সহজেই এটি চিনতে পারবেন। আপেল সিডার ভিনেগার বেশিরভাগই আপেলের রস, তবে খামির যোগ করলে রসের মধ্যে চিনি অ্যালকোহলে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়া হলো ফার্মেন্টেশন বাংলায় আমরা যেটাকে গাঁজন বলি। ব্যাকটেরিয়া অ্যালকোহলকে অ্যাসিটিক অ্যাসিডে পরিণত করে। এটিই ভিনেগারকে এর টক স্বাদ এবং তীব্র গন্ধ দেয়। আপেল সিডার ভিনেগার গলা ব্যথা এবং ভেরিকোজ ভেইন এর একটি ঘরোয়া প্রতিকার হিসাবে ব্যবহারের  দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।যদিও এর কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে স্ট্রংলি প্রমানিত নয় তবুও সম্প্রতি কিছু গবেষনায় এর অনেক গুনাগুনের প্রমান পাওয়া গেছে আর কিছু বিষয়ের গবেষনা এখনও চলমান রয়েছে। খামির এবং ব্যাকটেরিয়ার মেঘ যা আপেল সিডার ভিনেগারের বোতলে দেখা যায়, মূলত এটিই আপেল সিডার ভিনেগারকে স্বাস্থ্যকর করে তোলে। এগুলো প্রোবায়োটিক, পরিপাকতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে হজম ত্বরান্বিত করে। 

 

পুষ্টি উপাদান

আপেল সিডার ভিনেগারে উল্লেখযোগ্য পুষ্টি উপাদান নেই । এর মধ্যে শতকরা ৯৪ভাগ পানি থাকে। চর্বি বা প্রোটিন, ভিটামিন থাকে না। ১০০গ্রাম থেকে মাত্র ২২ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। শতকরা ১ ভাগেরও কম শর্করা থাকে। আর সামান্য পরিমানে খনিজ যেমন ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, লৌহ, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, জিংক ইত্যাদি থাকে। 

 

আপেল সিডার ভিনেগারের উপকারিতা

আপেল এর উপকারিতা অনেক এটা আমরা জানি। আপেল থেকে যেহেতু এই ভিনেগারটি তৈরি হচ্ছে, তাই আপেলের উপকারিতার মতো আপেল সিডার ভিনেগারেরও অনেক উপকার থাকার কথা। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় আপেল সিডার ভিনেগার এর ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্য করা যায়। এর উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করলে যা যা বলতে হবে তা হলোঃ

 

ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রনে

2019 সালের একটি পর্যালোচনা এবং মেটা-বিশ্লেষণ দেখিয়েছে যে আপেল সিডার ভিনেগার সেবনের ফলে সুস্থ ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণ উন্নত হতে পারে। “স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিদের মধ্যে গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণ আরও স্পষ্ট ছিল যখন আপেল সিডার ভিনেগার স্টার্চযুক্ত খাবারের ঠিক আগে খাওয়া হয়েছিল,” ডাঃ বানিনি মতে ।

টাইপ 2 ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে, 12 সপ্তাহ ধরে আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার ফলে হিমোগ্লোবিন A1C (HbA1c) 0.16% হ্রাস পায়। তবে অ্যাপেল সিডার ভিনেগারের ট্যাবলেট গ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে এই প্রভাব দেখা যায়নি। তবে গবেষণায় দেখা যায় যে এটি AMPK (অ্যাডিনোসিন মনোফসফেট-অ্যাক্টিভেটেড প্রোটিন কিনেস) পথের সক্রিয়করণ, ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি, খাবারের পরে তৃপ্তি এবং গ্যাস্ট্রিকের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। অন্য গবেষনায় দেখা যায়, নিয়মিত রাতে ঘুমানোর আগে এটি সেবন করলে শতকরা ৪ ভাগ পর্যন্ত শর্করার পরিমান হ্রাস পায়। 

 

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রনে

আপেল সিডার ভিনেগার প্রাণী এবং মানুষ উভয়ের উপর গবেষণায় দেখা গেছে, টোটাল  কোলেস্টেরল, এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমতে। কেন এবং কীভাবে এটি ঘটে তা নিয়ে গবেষণা চূড়ান্ত নয়, তবে এটি এএমপিকে পাথওয়ে অ্যাক্টিভেশন, লাইপোজেনেসিস হ্রাস, তৃপ্তি এবং শক্তি ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।

 

জীবানু প্রতিরোধী

বিভিন্ন ক্ষতিকর রোগ জীবানু ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে আপেল সিডার ভিনেগার কার্যকরী ভূমিকা রাখে। আপেল সিডার ভিনেগার ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে। আপেল সিডার ভিনেগার ক্ষত জীবাণুমুক্ত করার জন্য এবং ছত্রাকের চিকিতসার জন্য ব্যবহার করা হতো। এটি ই-কোলাই-এর মতো ব্যাকটেরিয়াকে খাদ্য নষ্ট করা থেকেও বাধা দেয় তাই এটি প্রায়শই খাদ্য সংরক্ষণকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম প্রিজারভেটিভের চেয়ে ভালো।

 

ক্যান্সার প্রতিরোধে

ক্যান্সার অসংক্রামক ব্যাধি হলেও  মহামারীর মতো হয়ে গেছে অনেকটা। ডিজিটালাইজেশন, নগরায়ন,শিল্পায়ন বিস্তারে প্রকৃতির প্রতি আমরা বিরুদ্বাচরন করছি। ফলে বদলে যাচ্ছে জলবায়ু আর সৃষ্টি হচ্ছে ভয়ঙ্গকর সব ব্যাধি। সেরকম একটি রোগ হলো ক্যান্সার। যখন অ্যাপেল সিডার ভিনেগার এবং ক্যান্সারের কথা একসাথে আসে, তখন দেখা গেছে যে অ্যাপেল সিডার ভিনেগার ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে । ক্যান্সারের অনেক কারণ রয়েছে ।  এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, আমরা যা জানি তা হলো আপেল সিডার ভিনেগার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে এবং ক্যান্সার কোষ (টিউমার) বৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে। তবে অ্যাপেল সিডার ভিনেগার ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা বা যারা বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমাতে চান তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনধারার  বিকল্প হিসেবে নেয়া উচিৎ নয়।

 

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে

আপেল সিডার ভিনেগার একই সাথে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এর মধ্যে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপের জন্যে দায়ী দুটি কারন হলো রক্তে চর্বির পরিমান বেশি হওয়া ও মানসিক উত্তেজনা। আপেল সিডার ভিনেগার এই দুটিকেই কমাতে পারে ফলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে থাকে।

 

হজমে সাহায্য করে

 আপেল সিডার ভিনেগার পরিপাক প্রক্রিয়া সঠিকভাবে হতে সাহায্য করে।

এটি বুক জ্বালাপোড়া বা হার্টবার্ন দূর করা, ফোলা কমানো ও সামগ্রিক পরিপাক নালিকে সুস্থ রাখে। পেটে অস্বস্তি এবং ব্যথা স্বাভাবিক কিছু নয়। যখন আমরা খাবারের পরে ব্যথা এবং অস্বস্তি অনুভব করি, তখন বুঝতে হবে যে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে । হতে পারে আমরা খুব বেশি খেয়েছি বা নয়তো আমাদের পরিপাকতন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করে না। সুস্থ হজম মানে পাকস্থলীতে সঠিক পরিমানের অ্যাসিডের মাত্রা যাতে আমাদের খাবারের পুষ্টি উপাদানগুলো শোষিত হতে পারে। যখন পর্যাপ্ত অ্যাসিড না থাকে, তখন খাবার সঠিকভাবে পরিপাক হয় না।

হজমের জন্য আপেল সিডার ভিনেগার পান করা মানে অ্যাসিড উৎপাদন বৃদ্ধি করা। আর এতেই সঠিক হজম হয়। 

 

 

ওজন কমাতে 

ওজন কমাতে আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার প্রচলন খুবই জনপ্রিয়। বেশিরভাগ মানুষ ওজন কমানোর জন্য আপেল সিডার ভিনেগার ব্যবহার করেন, কিন্তু তারা আপেল সিডার ভিনেগারের বাকি স্বাস্থ্য উপকারিতা জানেন না। কারণ আপেল সিডার ভিনেগার যুগ যুগ ধরে ওজন কমানোর সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হত। ওজন কমানোর জন্য আপেল সিডার ভিনেগার আসলে কাজ করে এমন বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। তারা আরও খুঁজে পেয়েছেন যে এটি খাদ্যতালিকাগত পরিবর্তন ছাড়াই কাজ করে। 

 

স্কিন ও চুলের যত্নে

আপেল সিডার ভিনেগারের স্বাস্থ্য উপকারিতা ছাড়াও, চেহারা এবং চুলের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে। এরকম কয়েকটি উপকারিতা হলোঃ

  • ব্রণের প্রকোপ হ্রাস করে।
  • রোদে পোড়া ত্বকের ক্ষতি রোধ করে।
  • বার্ধক্যের চাপ দূর করে।
  • চুলের স্বাস্থ্য উন্নত করে।
  • চুলের জট কমায়।
  • চুলের কোঁকড়া কমায়।
  • চুলের কিউটিকল সিল করে এবং চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে ও খুশকি দূর করে।

 

আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম

একটা জিনিস উপকারী কিংবা খেতে সুস্বাদু হলেই সেটি যত খাবো তত শরীরের জন্যে ভালো হবে এমন কিন্তু নয়। এটি করলে উপকারের চেয়ে বরং ক্ষতির পরিমান বেশি হবে। তাই অবশ্যই খেতে হবে সঠিক  নিয়ম ও পরিমিত পরিমানে। এটি অনেকটা ভিনেগার খাওয়ার নিয়ম এর মতোই।

এটি যেহেতু এক প্রকার ভিনেগার তাই এটি বিভিন্নভাবে সালাদের সাথে, গরম পানির সাথে খাওয়া যেতে পারে। তবে গরম পানির  সাথে মিশিয়ে খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। প্রতিদিনের সাধারণ ডোজ হল 15-30 মিলি। মূলত, 1-2 টেবিল চামচ আপেল সিডার ভিনেগার – জলের সাথে মিশ্রিত করে বা টনিক তৈরি করে বা সালাদ ড্রেসিংয়ে যোগ করে খেতে পারেন। আমার পরামর্শ হল এক টেবিল চামচ দিয়ে শুরু করুন এবং তারপরে 2 টেবিল চামচ পর্যন্ত বাড়ান যদি আপনি কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লক্ষ্য না করেন। 

 

আপেল সিডার ভিনেগারের দাম কত?

বাজারে অনেক ব্রান্ডের আপেল সিডার ভিনেগার পাওয়া যায়। এগুলোর দাম সর্বনিম্ন ১৫০টাকা থেকে শুরু করে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

 

পাশ্বপ্রতিক্রিয়া

আপেল সিডার ভিনেগারের তেমন পাশ্বপ্রতিক্রিয়া নেই তবে অত্যধিক পরিমানে খেলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। আপনার যদি পেটের আলসার বা কিডনির সমস্যা থাকে তাহলে অবশ্যই পরিহার করতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ত্বকে জ্বালাপোড়া, পেটের সমস্যা, হাড় ও দাঁতের সমস্যা করতে পারে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Main Menu