নিমের তেল ও নিম পাতার উপকারিতা

নিমের তেল ও নিম পাতার উপকারিতা

নিম আমাদের সবার অতি পরিচিত একটি ঔষধি গাছ। নিম পাতার উপকারিতা এত বেশি যে আধুনিক উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞানের মধ্যেও নিমের সক্রিয় অবস্থান রয়েছে। আর আমাদের এই উপমহাদেশে নিমের চিকিৎসা একটি প্রাচীন  ঐতিহ্যের অংশ। শত শত বছর ধরে আমরা আমাদের বাবা-মা এবং দাদা-দাদির কাছ থেকে নিম পাতা খেলে কি উপকারিতা পাওয়া যায় তা জেনেছি। নিম গাছের প্রতিটি অংশ ছাল, বীজ, শিকড়, ফল, পাতা, ডাল বা ফুল আমাদের শরীরের জন্য কোনো না কোনোভাবে উপকারী। এছাড়াও নিম বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক ওষুধের একটি অপরিহার্য উপাদান যা জ্বর, চর্মরোগ, শিলাবৃষ্টির সমস্যা, প্রদাহ এবং দাঁতের ব্যাধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগের  চিকিৎসা করে। এই আর্টিকেলে আমরা নিম পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

নিম কি?

নিমকে ইংরেজিতে Neem-ই বলা হয়। নিমের সাইন্টিফিক নাম Azadirachta indica.  নিম নিয়ে আমরা একটা কথা শুনি যে, নিম গাছের নিচে ঘুমালেও নাকি রোগ ব্যাধি কমে যায়। নিমের আদি নিবাস ধরা হয় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমার এই অঞ্চলকে । বর্তমানে এটি এই দেশগুলো ছাড়াও এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে পাওয়া যায়। সৌদি আরবের বিখ্যাত ও মুসলিমদের পবিত্র স্থান আরাফাতের ময়দানে সারি সারি নিম গাছ দেখা যায়, যেগুলো বাংলাদেশের লাগানো। ইন্টারনেটে খুজে এসব নিম গাছের ছবি দেখতে পারেন। খ্রীষ্টপূর্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে নিমের অস্তিত্ব পাওয়া যায় ভারত উপমহাদেশে। নিম গাছ প্রাপ্ত বয়স্ক হতে প্রায় ১০ বছর সময় নেয়। এ সময়ে এটি সর্বোচ্চ বিশ মিটারের মতো লম্বা হয়। গাছ জুড়ে পাতা থাকে। নিম গাছে ফলও হয় এক ধরনের। বৃষ্টিপাত বেশি হয় এমন স্থান গুলোতে নিম গাছ ভালো জন্মে তবে কম বৃষ্টিপাতযুক্ত স্থানেও নিম জন্মায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও নিমের স্বীকৃতি রয়েছে। জাতি সংঘের স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা WHO নিমকে “একুশ শতকের বৃক্ষ” হিসেবে অভিহিত করেছে। নিম নিয়ে বাংলাদেশ ভারতের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও গবেষনা হয়।

নিম অনেক উপকারী রাসায়নিক উপাদানে ভরপুর। নিম্বন, স্যাপোনিন, কুয়ারসেটিন, গ্লাইকোসাইড, বিভিন্ন রকমের জৈব এসিড, মেলানিন, ট্যানিন, মারগোসিন ইত্যাদি। 

নিম পাতার উপকারিতা

নিম পাতা(neem patar upokarita) অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতায় ভরপুর। নিম  পেস্ট আকারে, চায়েও খাওয়া যেতে পারে বা আপনি গাছ থেকে তাজা পাতা চিবিয়েও খেতে পারেন যদি সহ্য হয় কারন সবার পক্ষে এটি খাওয়া সম্ভব না। নিম পাতার স্বাদ তেতো এবং তিক্ত উভয়ই। কিন্তু যে কোনো রূপে নিম খাওয়া ফ্রি র‌্যাডিক্যাল স্ক্যাভেঞ্জিং-এর কার্যকলাপকে বাড়িয়ে তুলতে পারে, আমাদের রক্ত ​​থেকে টক্সিন দূর করতে পারে এবং নিউরোমাসকুলার ডিজঅর্ডারের ভারসাম্য বজায় রাখতে নিমের জুড়ি নেই। নিম অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিকার্সিনোজেনিক, অ্যান্টিসেপটিক, অ্যান্টিম্যালেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ভাইরাল বৈশিষ্ট্যেসম্পন্ন। যা এটিকে একাধারে প্রায় সমস্ত  স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিকার হিসেবে গড়ে তোলে।   আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে এখনও সর্দি কাশি জনিত সংক্রামক ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তির বিছানার কাছে নিম পাতা ছিটিয়ে দেয়ার প্রচলন রয়েছে। তাদের দরজায় এক গুচ্ছ নিম পাতা ঝুলিয়ে রাখা হয় যাতে নিম পাতার উপর দিয়ে যাওয়া বাতাস রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস ধ্বংস করে।

খুশকি দূর করে

খুশকি দূর করতে নিমের পরামর্শ দেওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। নিমের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন ই, যা ত্বকের কোষ পুনরুজ্জীবিত করে, যা মাথার ত্বক স্বাস্থ্যকর ও প্রদাহমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। একটি গবেষণায় নিম পাতার রসকে বিভিন্ন ধরণের মানব রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে একটি অ্যান্টিফাঙ্গাল হিসাবেও দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে একটি ছিল ক্যান্ডিডা। ক্যান্ডিডা খামিরের সংক্রমণ ঘটায় আর খুশকি অতিরিক্ত খামির বৃদ্ধির ফলাফল হতে পারে। 

ত্বকের সমস্যা দূর করে

নিম পাতার অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে, এটি ত্বকের যেকোনো রকমের সমস্যায় কার্যকরী ভূমিকা রাখে। গবেষণার সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে নিমের ত্বকের অবস্থার উপর প্রভাব রয়েছে। ব্রণ, সোরিয়াসিস এবং একজিমা সবগুলোর ক্ষেত্রেই ত্বকের প্রদাহ একটি কারন যা নিমের সাহায্যে নিরাময় হয়। 

এছাড়াও পূর্বে উল্লিখিত নিমে ভিটামিন ই রয়েছে, যা একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা ত্বকের  কোষের ক্ষতি রোধ করে এবং কোষ পুনর্গঠন করে। 

মাথার উকুন দূর করে

উকুনের জন্য কিছু শ্যাম্পুতে নিম পাতার নির্যাস থাকে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, নিম মাত্র পাচ-দশ  মিনিটের  মধ্যেই উকুনের  ডিম এবং ইতিমধ্যেই ফুটে থাকা উকুনের লার্ভাকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। নিম উকুনকে অক্সিজেন পেতে বাধা দেয়। নিম পাতায় এজাদিরাক্টিন নামক একটি উপাদান থাকে যেটি কীটপতঙ্গের প্রজনন ক্ষমতা ও হরমোন ধ্বংস করে দেয়। ফলে মাথায় নিম পাতা(nimpata upokarita) ব্যবহারের ফলে উকুন মরে যায় আর নতুন করে জন্মানোর সুযোগ পায় না। 

ওরাল আলসার দূর করে

ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের কারনে মুখের মধ্যে ক্ষত বা আলসার হয়। এটি মুখে ব্যথা, খেতে সমস্যা, মুখে দুর্গন্ধ এমন কি পেটের সমস্যা পর্যন্ত করতে পারে।  নিমের  নিম্বিডিন এবং আজাদিরাকটিন উপাদানগুলো এসব  ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দূর করতে সাহায্য করে। এই প্রভাব মৌখিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। পাতার মতো নিম গাছের অন্য অংশেও জীবাণুনাশক এবং অ্যাস্ট্রিঞ্জেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বহুকাল আগে থেকে লোকেরা তাদের দাঁত ব্রাশ করার জন্য নিমের ডাল ব্যবহার করত। এখনও সেটার প্রচলন রয়েছে। মুসলিমদের এই মেসওয়াক ব্যবহারকে পুণ্য হিসেবে দেখা হয়। এবং মহানবী (সাঃ) এটি ব্যবহার করেছেন। এটি ব্যবহারের ফলে ওরাল আলসার, মুখের দুর্গন্ধ দূর হয় দাঁত পরিষ্কার হয়।

রক্ত পরিষ্কার করে

নিম রক্ত পরিষ্কার করতে পারে। নিমে অনেক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকার কারনে এটি রক্তকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করতে পারে। নিম রক্ত ​​থেকে বিষাক্ত পদার্থ শোষণ করতে এবং লিভার এবং কিডনিতে পরিবহনে ভূমিকা পালন করতে পারে। শরীর থেকে বর্জ্য বের করার প্রধান দুটি অঙ্গ হলো কিডনি ও লিভার । নিম পাতা খাওয়ার ফলে এই অর্গানগুলোর কার্যক্রম সঠিকভাবে  পরিচালিত হতে পারে। ফলে শরীরে বর্জ্য জমে ক্ষতি হবার আশঙ্কা থাকে না।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে

নিম নানাভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। নিমের মধ্যে রয়েছে কোয়ারসেটিন, যা রক্তে শর্করাকে কমাতে পারে বলে কিছু গবেষণায় পাওয়া গেছে । এছাড়াও নিমে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড এবং পলিফেনল থাকে যা রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে। একটি গবেষনায় দেখা যায় নিমের মধ্যে থাকা উপাদান ইনসুলিন উৎপাদন বাড়ায় যদিও গবেষনাটি বেশিরভাগই ইঁদুর বা ইন ভিট্রো মডেলে করা হয়েছে। মেটফর্মিন থেরাপির  আরেকটি গবেষনায় দেখা যায়, নিমের উপাদান রক্তের শর্করা কমাতে পারে। ডায়াবেটিসকে সকল রোগের জননী বলা হয়। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকলে হার্ট, মস্তিষ্ক, কিডনি, লিভার ভালো থাকে। তবে ডায়াবেটিসের রুগীদের অবশ্যই নিম খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

অন্ত্রের কৃমি প্রতিরোধ করে

নিমের অ্যান্টিপ্যারাসাইটিক গুণ রয়েছে। প্রক্রিয়াটি একই রকম হতে পারে যেভাবে নিম উকুনকে মেরে ফেলে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে অ্যাজাডিরাকটিন কীটপতঙ্গকে পুনরুৎপাদন করতে বাধা দেয়। নিম পাতার( nim patar upokarita) রস অন্ত্রের কৃমি দূর করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ উপকার পেতে নিম চা খেতে পারেন।

আর্থ্রাইটিস উপশম করে

নিম আথ্রাইটিসের প্রদাহ ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, নিম তেলের প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এটি দীর্ঘকাল ধরে আর্থ্রাইটিস উপশম করতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আথ্রাইটিস একটি প্রদাহ জনিত অসুখ। ক্যাটিচিন নামক একটি যৌগ প্রদাহ কমায় বলে ধারনা করা হয়। অন্য গবেষণায় বলা হয়েছে যে, এটি কোয়েরসেটিন যা প্রদাহ কমানোর মধ্য দিয়ে আথ্রাইটিস উপশম করে। 

নখের সমস্যা নিরাময় করে

হাত পায়ের নখে ছত্রাকজনিত সমস্যা আমাদের দেশে খুব কমন একটি সমস্যা । বৃষ্টির দিনে এটি সাধারনত বৃদ্ধি পায়। নখে সংক্রমন হলে প্রচণ্ড ব্যথার পাশাপাশি দুর্গন্ধযুক্ত পুজ হয়। নখ দিয়ে রক্ত পড়ে।নখের সংক্রমণ সাধারণত ডার্মাটোফাইট এবং ক্যান্ডিডা দ্বারা সৃষ্ট হয়। একটি ক্লিনিকাল গবেষণায়, ৫% নিম তেলের নির্যাস ৪ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন দুবার ব্যবহার করলে নখের ছত্রাকজনিত সমস্যা সেরে যায় । এটি অনেকটা ডার্মাটোলজিকাল ক্রিমের মতোই কাজ করে।

অন্যান্য সুবিধা

উল্লিখিত বিষয়গুলো  ছাড়াও, নিমের অ্যান্টিটিউমার বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কার্যকর । নিম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

নিমের পুষ্টিগুণ

এক কাপ নিম পাতায় ৫০ ক্যালোরির কম, ২ গ্রাম প্রোটিন, ৮ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট এবং সামান্য চর্বি থাকে। নিম পাতা(nimpata) ফাইবার, আয়রন এবং ক্যালসিয়ামের খুব ভালো উৎস, এক কাপ নিম রস-ই এই পুষ্টির প্রতিটির প্রায় ৩০% RDA প্রদান করে। এছাড়া ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়ামের একটি ভাল উৎস এবং অল্প পরিমানে সোডিয়াম থাকে। নিমের তেলে রয়েছে ফ্যাটি অ্যাসিড, ওলিক অ্যাসিড, লিনোলিক অ্যাসিড এবং পালমিটেট। অলিক অ্যাসিড হল একটি ওমেগা-9 ফ্যাটি অ্যাসিড, বা মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট। লিনোলিক অ্যাসিড হল একটি অসম্পৃক্ত চর্বি এবং পামিটিক অ্যাসিড হলো একটি স্যাচুরেটেড ফ্যাট।

নিম পাতার রসের উপকারিতা

নিম পাতার রস আপনার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অনেকভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। নিম পাতাকে চেঁচে রস করে পান করলে এসব উপকারিতা পাওয়া যায়।

জন্ডিস দূর করে

জন্ডিস হয় মূলত দূষিত পানিতে থাকা বিভিন্ন ভাইরাসের কারনে। এটি আপনার লিভার সংক্রমিত করে ও এর কার্যক্রমকে ব্যহত করে। নিয়ম করে সপ্তাহখানেক নিম পাতার রস খেলে এই সমস্যা কমে যায়। 

কৃমি দূর করে

বাচ্চা কিংবা বয়স্ক সবারই এই কৃমিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। নিম পাতাঁর রস ৩ দিন ২-৩ চামুচ করে খেলেই কৃমির সমস্যা কমে যাবে।

চুলের সৌন্দর্য বাড়ায়

নিম যেমন চুলের খুশকি দূর করে তেমনি আপনার চুলকে সিল্কি করে আকর্ষনীয় করে গড়ে তুলতে সাহয্যা করে। নিম পাতা বেটে চুলে ঘন্টাখানেক লাগিয়ে রাখলে চুল সুন্দর ও কালো হয়। নিম পাতার রস শ্যাম্পুর মতোই ব্যবহার করা যায়

ডায়েটে নিম অন্তর্ভুক্ত করার উপায়

নিম পাউডার, ক্যাপসুল, তেল বা রস হিসাবে পাওয়া যায়। নিম চা পান করাও নিম খাওয়ার একটি জনপ্রিয় উপায়। নিম ফল কাঁচা বা রান্না করে খাওয়া যেতে পারে, এবং কখনও কখনও পানীয় হিসাবে তৈরি করা যেতে পারে, যার মধ্যে একটি গাঁজানো অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় রয়েছে। উদ্ভিদ থেকে পরিশোধিত নিম তেল রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে। যারা কাঁচা নিম পাতা তেঁতো স্বাদের জন্যে খেতে পারেন না তারা ক্যাপসুল হিসেবে খেতে পারেন। আমাদের দেশে এক সময় পাওয়া যেত না এখন নিমের ক্যাপসুল পাওয়া যায়। এছাড়া নিমের সিরাপও পাওয়া যায়। যাদের নিমের তেঁতো স্বাদ পছন্দ না তারা এতে মধু মিশিয়েও খেতে পারেন।

নিম তেল এর উপকারিতা

নিম তেল তৈরি হয় নিম গাছের বীজ থেকে। যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কীট পতঙ্গ দূর করে

শহরে বিছানার আতঙ্ক হলো চারপোকা। এটি একবার হয়ে  গেলে আর দূর করা অনেক কঠিন। এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) রিপোর্ট করে যে কিছু অনুমোদিত সক্রিয় উপাদানের সাথে মিলিত হলে, নিম তেল বাড়িতে এবং বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই বেড বাগের বিরুদ্ধে নিরাপদ এবং কার্যকর হতে পারে। এটি বিছানায় পানির সাথে মিশিয়ে স্প্রে করে দিতে পারেন।

ব্রন দূর করে 

নিম বীজের তেলে অপরিহার্য ফ্যাটি অ্যাসিড (EFAs), ট্রাইগ্লিসারাইডস, ভিটামিন ই এবং ক্যালসিয়াম বেশি। এর ইএফএ এবং ভিটামিন ই এর কারণে, নিম বীজের তেল ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে তীব্র শুষ্কতার ফলে ছোট ছোট ফাটল নিরাময় করে। নিমের মধ্যে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিন ই ত্বক সহজেই শুষে নেয় এবং ত্বককে অতিরিক্ত তৈলাক্ত হতে দেয় না। নিম সাধারণত ত্বকের যত্নের পণ্যগুলোতে পাওয়া যায় যা প্রাকৃতিকভাবে ব্রণের বিরুদ্ধে লড়াই করে, গবেষনায় দেখা যায়, নিমের তেলে এমন এন্টিব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ব্রনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে কার্যকর এবং এটি ব্রন দূর করেত পারে।

চুল এবং মাথার ত্বক ভালো রাখে

নিম বীজের তেল শুষ্ক চুলের উন্নতি এবং ফ্যাটি অ্যাসিড উপাদানের কারণে মাথার ত্বকের পুষ্টির জন্য দুর্দান্ত। এর অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য মাথার ত্বককে যেকোনো সংক্রমন থেকে রক্ষা করে। আপনি আপনার ব্যবহার্য শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, লোশনে সামান্য নিমের তেল মিশিয়ে নিতে পারেন এর গুনাগুন বাড়িয়ে তোলার জন্যে।

ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর

নিমের তেল ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে বলে প্রমান পাওয়া গেছে । আমেরিকান মস্কিটো কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে রিপোর্ট করা হয়েছে, ২ শতাংশ নিম তেল, যখন নারকেল তেলের সাথে মিশ্রিত করা হয় এবং তা মানব শরীরে প্রয়োগ করা হয়, তখন সমস্ত অ্যানোফেলিস প্রজাতির কামড় থেকে প্রায় ১২ ঘন্টা সম্পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করে। আমাদের দেশে নিমের সহজলভ্যতার কারনে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কম। 

নিরাপদ ব্যবহার

আপনার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় নিম অন্তর্ভুক্ত করার সময় এখানে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।

গর্ভবতী মহিলাদের নীম ব্যবহার করা উচিত নয় কারণ এটি কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটাতে পারে। যারা অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত তাদের চরম সতর্কতার সাথে নিম ব্যবহার করা উচিত।

নিম ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপিত করতে পারে এবং তাই যারা ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ গ্রহণ করে তাদের এটি ব্যবহার করা উচিত নয়।

শিশুদের নিম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে । কারণ খিঁচুনি, কোমা এবং এমনকি মৃত্যু সহ গুরুতর স্নায়বিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিম তেলের থাকতে পারে। তবে তা কেবল শিশুদের ক্ষেত্রে।

নিম অভ্যন্তরীণভাবে সম্পূরক বা চা আকারে ব্যবহার করা উচিত।

আপনার ডায়াবেটিস থাকলে আপনি যদি মেটফরমিন সেবন করে থাকেন তবে ডায়াবেটিস হাইপো হওয়ার সতর্ক থাকতে আপনাকে নিম সেবনের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

নিম তেল ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

যদিও নিম তেলের রোগ নিরাময়ের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তবে এর কিছু ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। নিমের তেল মুখে খাওয়া শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। কিডনি বা লিভারের সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের অনুমোদন ছাড়া নিমের তেল ব্যবহার করা উচিত নয়।

নিম তেলের একটি হালকা প্রশান্তিদায়ক প্রভাব রয়েছে যা তন্দ্রা এবং ক্লান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলে জানা যায়। অতএব, এটি সঠিকভাবে, সাবধানে এবং নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এড়াতে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করাই শ্রেয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Main Menu